শনিবার, ০৯:৩৪ অপরাহ্ন, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গৌরনদীতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত দেশে কি আদৌ কোনো সরকার আছে, প্রশ্ন জামায়াত আমিরের আজ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হৃদয়-মুশফিকের ব্যাটে বাংলাদেশের ১০০ ভরাডুবির পর ট্রাম্পের নতুন চিফ অব স্টাফের দায়িত্বে মিলার জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা যুদ্ধ যখন অনিবার্য, মেজর মেজর জিয়া তখন যুদ্ধের ডাক দিলেন-জহির উদ্দিন স্বপন তৃণমূল পর্যায়ের সরকার হচ্ছেন গ্রাম পুলিশ গৌরনদীতে গ্রাম পুলিশকে উদ্দেশ্য করে……. জহির উদ্দিন স্বপন  যুগে যুগে এমপি-মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী আসবেন, শত বছরেও একজন কবি নজরুল তৈরি হবেন না…… জহির উদ্দিন স্বপন গৌরনদীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২’-এর শুভ উদ্বোধন

খামেনির জানাজা দেখিয়ে দিল পৃথিবী ভাগ হয়ে গেছে

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৭৬ বার পঠিত

কালো কাপড়ে মোড়া একটি কফিন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে তেহরানের রাস্তায়। বিলম্বিত গ্রীষ্মের গরমে লাখো মানুষের ভিড়। তাঁদের নিশ্বাসও যেন একসঙ্গে উঠছে-নামছে; যেন এক ছন্দে শোক আর প্রতিবাদ মিশে গেছে।

জনসমুদ্রের মাঝখানে কালো পোশাকের ঢেউয়ের ওপরে উঠে আসছে লাল মুষ্টিবদ্ধ হাত—এই শেষযাত্রার প্রতীক। এই হাত শুধু শোকের নয়, এটি প্রতিবাদেরও। চারপাশে একটাই স্লোগান—আমাদের দাঁড়াতেই হবে।

এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার দৃশ্য। টানা ৩৬ বছরের শাসন, নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একসময়ের অবসান। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলাতেই নিহত হন তিনি। কিন্তু এই জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি একধরনের ভূরাজনৈতিক বার্তা, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্বগত রায়।

সাত দিন ধরে দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে চলবে এই শেষযাত্রা। ইরানের হিসাবে, দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ এতে অংশ নেবেন। শতাধিক দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হাঁটছিলেন তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পাশে।

আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার নেতারাও এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মীরাও হাজির হয়েছেন কোনো সরকারি আমন্ত্রণ ছাড়াই। তাঁদের দাবি, তাঁরা ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। কফিনটি যাবে কুম শহর থেকে, তারপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাশহাদে দাফন করা হবে—ইমাম রেজার মাজারের পাশে।

পশ্চিমা বিশ্ব এই দৃশ্য দেখছে বিভ্রান্তি আর অবজ্ঞা নিয়ে। ফক্স নিউজ বলছে, এই জানাজায় পশ্চিমা নেতাদের অনুপস্থিতিই নাকি ইরানের একঘরে হয়ে পড়াকে প্রমাণ করছে। তারা এই বিশাল আয়োজনকে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্রের কারসাজি বলছে। এটিকে তারা একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মরিয়া বৈধতা খোঁজার চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা বড় ভুল। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে খামেনির এই শেষযাত্রা অন্য অর্থ বহন করে। এটি এমন এক ইতিহাসের স্মরণ, যা পশ্চিমা বিশ্ব ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে গেছে। এ ঘটনা ১৯৫৩ সালে অপারেশন অ্যাজ্যাক্স-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন সিআইএ ও এমআই সিক্স মিলে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে পশ্চিমা তেলের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি আশির দশকে সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র দেওয়া, ২০০৩ সালে ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ, লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার বিপর্যয়—এসব ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। কারণ, এসব ঘটনা আলাদা ঘটনা নয়; বরং আধিপত্য বিস্তারের একটানা কাঠামো।

ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষযাত্রার পথও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাজনীতিকদের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়; বরং একটি বার্তা—প্রতিরোধ কোনো এক জায়গার ওপর নির্ভর করে না। একজন নেতা চলে গেলেও নেতৃত্ব থেমে যায় না।

ইরানের সাবেক এক ডেপুটি স্পিকার এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে বলেছেন—খামেনির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সেই আধিপত্যকে ভেঙে দেওয়ার বাস্তব প্রমাণ। পশ্চিমা বিশ্ব ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের হামলাকে দেখছে একটি কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে। তারা এটিকে দেখছে শত্রুদেশের নেতার মাথা কেটে ফেলার মতো নিখুঁত আঘাত হিসেবে। তবে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনও স্বীকার করেছে, ইরানের নেতৃত্ব এত বিস্তৃত যে কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেশকে অচল করা যাবে না।

সার্বভৌমত্বের বিষয়টি পশ্চিমা দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত একটি আনুষ্ঠানিক বিষয়। তাদের কাছে বিচার মানে প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত প্রক্রিয়া। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কাছে সার্বভৌমত্ব হলো বাইরের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়। এখানে বিচার মানে ঐতিহাসিক ও পুনর্বণ্টনমূলক ন্যায়, যা এখনো অর্জিত হয়নি। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একে অন্যের সঙ্গে মেলে না। খামেনির জানাজা সেই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। এক পক্ষের কাছে এটি ‘প্রচার’, অন্য পক্ষের কাছে এটি সত্য।

এই শেষযাত্রার বিশেষত্ব এখানেই, এখানে শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। পশ্চিমা হামলা যেখানে নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, সেখানে এই জনসমুদ্র দেখাচ্ছে, সমাজ নিজেই নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই সমাবেশ যেন এক জীবন্ত ঘোষণা—অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটি যেন উল্টো একধরনের জীবরাজনীতি। সাম্রাজ্য হত্যা করে মানুষকে ভীত ও অনুগত রাখতে চায়। আর প্রতিরোধ শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানুষকে একত্র করে, প্রতিবাদী করে তোলে। ফলে প্রতিটি শোকাহত মানুষই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অংশ। এই জানাজা তাই একধরনের সংহতির শক্তি।

এখানেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কী অপরাধ, কী অন্যায়—তা নিয়েই যখন সবাই একমত নন, তখন নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা টিকতে পারে না। গ্লোবাল সাউথ মনে করে, এই ‘নিয়মভিত্তিক’ ব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট, তাই তাদের আস্থা কমে যায়। অন্যদিকে পশ্চিম সেই অভিজ্ঞতাকে ভুল বা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেয়। ফলে নিজেদের ভুল ঠিক করার সুযোগও থাকে না। এ কারণে আলাপ–আলোচনার সুযোগ কমে, বিভাজন বাড়ে। প্রত্যেক পক্ষ নিজের মতো করে যুক্তি দাঁড় করায় নিজের মানুষদের বোঝানোর জন্য। খামেনির জানাজা তাই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দেখিয়ে দেয়, আমরা একই গ্রহে আছি, তবে আমরা আর একই দৃষ্টিভঙ্গির পৃথিবীতে বাস করছি না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার যে সামরিক শিল্প জোটের কথা বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাত চালিয়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই তাদের পরীক্ষার জায়গা ও লাভের ক্ষেত্র। এই জানাজা যেন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলছে—সাম্রাজ্যবাদীদের শান্তির চেয়ে শত্রু বেশি দরকার। আর খামেনির ইরান সেই প্রয়োজনীয় শত্রুর ভূমিকাই পালন করেছে। তাই এই শোক শুধু একজন মানুষের জন্য নয়। এটি একটি সম্ভাব্য পৃথিবীর জন্য, যেখানে সার্বভৌমত্ব মানে সত্যিকারের স্বাধীনতা।

পাকিস্তানের উপস্থিতি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ও জুনের সমঝোতা স্মারক তৈরিতে তারা সাহায্য করেছে। অথচ সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীই এখন তেহরানে দাঁড়িয়ে সেই নেতাকে সম্মান জানাচ্ছেন, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করেছে। এটি দ্বিচারিতা নয়; বরং বহুমুখী বিশ্বের বাস্তবতা।

ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষযাত্রার পথও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাজনীতিকদের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়; বরং একটি বার্তা—প্রতিরোধ কোনো এক জায়গার ওপর নির্ভর করে না। একজন নেতা চলে গেলেও নেতৃত্ব থেমে যায় না।

  • কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক
  • মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com