মঙ্গলবার, ১০:৫৩ অপরাহ্ন, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
গৌরনদীতে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় স্বামী গ্রেপ্তার মিসরের বিপক্ষে জিতলে আর্জেন্টিনার পরবর্তী খেলা কবে, প্রতিপক্ষ কে? ইমন গাজী হত্যা মামলায় সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি বাহার ও আ. লীগের ২ নেতা গ্রেপ্তার গৌরনদীতে মহিলা সংস্থার উদ্যোগে উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বীমা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে….. তথ্যমন্ত্রী ১৬ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরীক্ষা ফ্রি শ্রীপুরে পোশাক কারখানায় ৮০ শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ কোমে লাখো মানুষের শোকযাত্রা, বৃহস্পতিবার খামেনির দাফন ‘বসবাস অনুপযোগী’ শহরের তালিকায় আবারও তৃতীয় ঢাকা

চীন সফর ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার পঠিত

বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আজকের বিশ্বে কোন দেশ কার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, কোথায় সফর করছে এবং কী ধরনের কৌশলগত আলোচনা করছে- এসবই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং আঞ্চলিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

অনেকের নজর ছিল, বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রধান প্রথম কোন দেশে সফর করবেন। যদিও প্রথমে মালয়েশিয়া সফর হয়েছে, সেটিকে বড় কৌশলগত সফর বলা যায় না। কিন্তু এরপর চীন সফর আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক রাজনীতিকে নতুন কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চীন সফরের পর যেসব সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও যৌথ ঘোষণাপত্র সামনে এসেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ কাঠামোর আলোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়েও দুই দেশ নিয়মিত আলোচনায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ান প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি কূটনৈতিক বার্তা- বাংলাদেশ সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং নিজের স্বার্থ অনুযায়ীই কৌশল নির্ধারণ করবে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল, তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। কারণ নির্বাচনকালীন সরকারের বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যাওয়ার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নির্বাচনের ঠিক আগে বড় কৌশলগত চুক্তি করা হয় না। তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্ট ট্যারিফসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করায় নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার একটি নতুন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরের আলোচনা। এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়; বরং এর সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটও গভীরভাবে জড়িত। কারণ সম্ভাব্য করিডরটি বাস্তবায়ন করতে হলে রাখাইন অঞ্চলের স্থিতিশীলতা জরুরি। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ছাড়া এই ধরনের আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন।

চীন শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে উন্নয়নভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে আসছে। তাদের ধারণা, রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে। সেদিক থেকে এই করিডর শুধু বাণিজ্যিক নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশের একটি নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এই ধরনের করিডর বাস্তবায়নে ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে বাংলাদেশকে খুব সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে।

এ সফরের আরেকটি বড় দিক হলো অবকাঠামো, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কানেক্টিভিটির মতো খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি। বিশেষ করে মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত করার সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, এখনও মূলত অ্যাসেসমেন্ট বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়েই বিষয়টি রয়েছে। চীন এ ক্ষেত্রে খুব সতর্কভাবে এগোবে বলেই মনে হয়। কারণ তিস্তা ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে ভারতকে পাশ কাটিয়ে কোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়।

বর্তমান ভূরাজনীতিতে ভারত ও চীনের সম্পর্কেও পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। আগে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা যেভাবে ব্যবহৃত হতো, এখন সেখানে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যেও কিছু বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীন-ভারত সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তিস্তা নিয়ে ত্রিদেশীয় কাঠামো-বাংলাদেশ, ভারত ও চীন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এমনকি জাপান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বা বিশ্বব্যাংককে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়ামও হতে পারে। সেটি হলে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্নে সবার জন্যই সুবিধাজনক হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি একটি নতুন মডেল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। কারণ বর্তমান বিশ্বে সংঘাতের বদলে সহযোগিতাভিত্তিক উন্নয়ন মডেলের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এমওইউ সই আর বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। এখন বল বাংলাদেশের কোর্টে। সরকার ও নীতিনির্ধারকদেরই ঠিক করতে হবে, এই সুযোগগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যাবে।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তাহলে এই সফর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি নতুন পরীক্ষার সময়। কারণ এখন শুধু সম্পর্ক গড়ে তোলাই নয়, বরং সেই সম্পর্ককে দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com