সোমবার, ১২:২৪ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

উন্মাদনার বিশ্বকাপে আবেগি উড়াল

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশের জন্য এক অনন্য আবেগ, জাতীয় গর্ব, আত্মপরিচয় এবং ঐক্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক। মাঠে খেলোয়াড়রা ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে নামেন ঠিকই, কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু মাসের হাড়ভাঙা প্রস্তুতি, অসীম অপেক্ষা এবং কোটি কোটি সমর্থকের গগনচুম্বী প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশারই এক আবেগঘন ও বর্ণিল প্রকাশ দেখা যায় বিশ্বকাপের ঠিক আগে, যখন জাতীয় দলকে নিজ দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ নানা দিক থেকেই ঐতিহাসিক এবং অভিনব। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে এই বিশাল মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে। শুধু তাই নয়, এই আসরেই প্রথমবারের মতো ৩২টির বদলে ৪৮টি দেশ অংশগ্রহণ করছে। এর অর্থ হলো, বিশ্বের ৪৮টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, ৪৮টি ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন এবং ৪৮টি দেশের শতকোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা গিয়ে মিশতে চলেছে উত্তর আমেরিকার মাটিতে। ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল বিস্তৃতি বিশ্বকাপকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফুটবল মহাযজ্ঞের আগে প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় দলকে নিজ নিজ ভূখণ্ড থেকে কীভাবে বিদায় জানিয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য গল্পের ক্যানভাস। কোথাও আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ কনসার্ট ও প্রীতি ম্যাচের, কোথাও দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা, আবার কোথাও রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে হাজারো সমর্থক অশ্রুসিক্ত চোখে দলকে বিদায় জানিয়েছে। দৈনিক আমাদের সময়ের ‘বহুরৈখিক’ পাতার আজকের এই বিশেষ আয়োজনে আমরা তুলে ধরব ২০২৬ বিশ্বকাপের কয়েকটি আলোচিত দলের দেশ ছাড়ার সেই বর্ণিল, ব্যতিক্রমী ও আবেগময় মুহূর্তগুলো। বিস্তারিত- শামস্ বিশ্বাস

ব্রাজিল জলকামান সংবর্ধনা

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিদায়বেলা সব সময়ই পুরো ফুটবলবিশ্বের নজর কাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং আগের সব ঐতিহ্যকে ছাপিয়ে গেছে। রিও ডি জেনিরোর তেরেসোপোলিসে অবস্থিত বিখ্যাত ‘গ্রাঞ্জা কোমারি’ ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে যখন ‘সেলেসাও’রা উত্তর আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হয়, তখন হলুদ-সবুজ জার্সিতে মেতেছিল পুরো দেশ। সাম্বা নাচের ছন্দ আর ড্রামের তালে তালে ভক্তরা খেলোয়াড়দের বাসকে এসকর্ট করে নিয়ে যায়।

তবে মূল চমকটি ছিল গত ১ জুন, রিও ডি জেনিরোর গ্যালেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দলের বিমান উড্ডয়নের আগে ঐতিহ্যবাহী জলকামান (Water Cannon Salute) দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়। বিমানবন্দরের ফায়ার ট্রাকগুলো থেকে প্রবল পানির ধারা ছুড়ে বিমানকে প্রতীকীভাবে ‘ব্যাপ্টাইজ’ বা স্নান করানো হয়, যা সাধারণত এভিয়েশন বা ক্রীড়াজগতে বিশেষ কোনো মাইলফলকের জন্যই সংরক্ষিত থাকে। এই রাজকীয় অনুষ্ঠানটি জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। বিমানে ওঠার আগে নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং এন্ড্রিকের মতো তারকারা ভক্তদের জানান, তাদের এই যাত্রা হলো ‘ষষ্ঠ শিরোপার অভিযান’ বা ‘হেক্সা মিশন’। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এই আয়োজনকে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

গত কয়েকটি বিশ্বকাপে ব্রাজিল তাদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি ঠিকই, তবে প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানের কাছে বিশ্বকাপ মানেই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের মশাল হাতেই দেশ ছেড়েছে ব্রাজিল দল।

আর্জেন্টিনা মুচাচোস উন্মাদনা

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা দলের ওপর প্রত্যাশার চাপ এবার আকাশচুম্বী। অনেকেই মনে করছেন, এটি হতে পারে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। দেশ ছাড়ার আগে বুয়েনস আয়ারসে তারা তাদের বিদায়ী ফ্রেন্ডলি ম্যাচে জাম্বিয়ার বিপক্ষে ৫-০ গোলের এক বিশাল জয় উপহার দেয় দর্শকদের। এই জয় যেন সমর্থকদের উন্মাদনায় ঘি ঢেলে দেয়।

বুয়েনস আয়ারসের এজেইজা (Ezeiza) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যখন লিওনেল স্কালোনির দল দেশ ছাড়ছিল, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার সমর্থক নীল-সাদা পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে, কাতার বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ‘মুচাচোস’ গানের মূর্ছনায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের রাজকীয় বিদায় জানিয়েছে আর্জেন্টাইনরা।

প্যারাগুয়ে আবেগঘন ফ্লাইট ব্যাপ্টিজম

প্যারাগুয়ের মানুষের কাছে এবারের বিশ্বকাপ এক অন্যরকম আবেগের নাম। দীর্ঘ ১৬ বছর পর তারা বিশ্বকাপের মূল পর্বে ফিরেছে। ফলে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠানও হয়ে ওঠে অসাধারণ। রাজধানী আসুনসিওনের ‘ডিফেনসোরেস দেল চাকো’ স্টেডিয়ামে নিকারাগুয়ার বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে তারা ৪-০ গোলের বিশাল জয় পায়। এই ম্যাচে স্টেডিয়ামে ৩৪ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিল।

ম্যাচ শেষে শুরু হয় মূল বিদায় উৎসব। পুরো স্টেডিয়াম ফায়ারওয়ার্কস বা আতশবাজির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। দলের তরুণ তারকা জুলিও এনসিসো কিছুটা ইনজুরিতে পড়লেও তা উদযাপনে কোনো ভাটা ফেলতে পারেনি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল বিমানবন্দরে তাদের বিদায় জানানোর প্রথাটি। দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ‘ফ্লাইট ব্যাপ্টিজম’ বা বিমান অভিষেকের মাধ্যমে বিশ্বকাপগামী দলকে প্রতীকীভাবে শুভযাত্রা জানানো হয়। বিমানবন্দরে খেলোয়াড়দের একনজর দেখতে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছিল, যা প্রমাণ করে এই যাত্রা শুধু একটি দলের নয়, বরং এক প্রজন্মের অপেক্ষার অবসানের উদযাপন।

কলম্বিয়া প্রেসিডেন্টের উপহার নিয়ে

কলম্বিয়ার দলকে বিদায় জানান স্বয়ং প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো। বোগোটার এল ডোরাডো বিমানবন্দরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি খেলোয়াড়দের কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী টুপি ‘সোমব্রেরো ভুয়েলতিয়াও’ (Sombrero Vueltiao) উপহার দেন। অধিনায়ক জেমস রদ্রিগেজের নেতৃত্বে দলটি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছবি তোলে এবং তার উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য শোনে। যদিও সরকারি এই আয়োজনে কিছু খেলোয়াড়ের চেহারায় কিছুটা অস্বস্তি লক্ষ করা গেছে, তবু এ অনুষ্ঠান প্রমাণ করে যে, কলম্বিয়ায় জাতীয় পর্যায়ে ফুটবলের গুরুত্ব কতটা গভীর।

ইরান এক যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির স্বপ্নযাত্রা

২০২৬ বিশ্বকাপের দলগুলোর বিদায়বেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি ইরানের কথা। চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি পার করা একটি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ফুটবল যে কতটা বড় আশ্রয়ের জায়গা, ইরানের এই বিদায় সংবর্ধনা তারই প্রমাণ। সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং স্নায়ুক্ষয়ী বিষয়টি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বর্তমানে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) চলছে। আর নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস, সেই চিরশত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে ইরান!

গত ১৩ মে, ২০২৬ তারিখে তেহরানের বিখ্যাত ‘এঙ্গেলাব স্কয়ার’ (Enghelab Square) পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন তাদের প্রিয় জাতীয় দলকে বিদায় জানাতে। মানুষের ভিড় এতই বেশি ছিল যে, খেলোয়াড়দের বাস থেকে নামতেই বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়!

মূল অনুষ্ঠানের ঠিক আগে, জাতীয় দলের ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ক্রীড়ামন্ত্রী আহমেদ দুনিয়ামালি। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান খেলোয়াড়দের উদ্দেশে এক অনুপ্রেরণামূলক ভাষণে বলেন, ‘আজ আপনারা শুধু একটি ফুটবল দল নন, আপনারা সারাবিশ্বের সামনে ইরানি জাতির আশা, মর্যাদা, ঐক্য এবং দৃঢ় সংকল্পের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলাফলের চেয়েও বড় কথা হলো, আপনারা দেশের নামের জন্য লড়াই করবেন। আপনাদের সম্মান, সাহস এবং জাতীয় গর্বই হবে এই যাত্রার আসল অর্জন।’

এরপর সন্ধ্যায় আকর্ষণীয় লাল-কালো ট্র্যাকস্যুট পরে খেলোয়াড়রা যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন হাজার হাজার মানুষ পতাকা নাড়িয়ে এবং গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান কোচ আমির গালেনোয়ি এবং ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ। মেহদি তাজ আবেগাপ্লুত হয়ে এই আয়োজনকে ‘সাম্প্রতিক চার বিশ্বকাপের সেরা বিদায়’ বলে অভিহিত করেন।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল তাদের নতুন জার্সি উন্মোচন এবং নামকরণের পেছনের গল্প। লাল, সাদা ও সবুজ রঙের মিশেলে তৈরি নতুন এই জার্সিতে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘এশিয়াটিক চিতা’র (Asiatic cheetah) প্রতীক। এই চিতা কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির টিকে থাকার লড়াই, ক্ষিপ্রতা এবং অদম্য সাহসের প্রতীক হিসেবেই জার্সিতে তুলে ধরা হয়েছে।

এর পাশাপাশি, দলের এই বিশ্বকাপযাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনাব ১৬৮’ (Minab 168)। দক্ষিণ ইরানের মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রাথমিক ও প্রি-স্কুল শাখার শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত শহীদদের স্মরণে এই বিশেষ নামকরণ করা হয়, যা দলের যাত্রায় এক গভীর প্রতীকী এবং আধ্যাত্মিক মাত্রা যোগ করে। অনুষ্ঠানে দলের অধিনায়ক এহসান হাজসাফি পুরো দল ও কোচিং স্টাফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শপথ পাঠ করেন এবং নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলার প্রতিশ্রুতি দেন।

এই বিদায় অনুষ্ঠানটি নিছক কোনো ক্রীড়া আয়োজন ছিল না; এটি ছিল এক চরম ভূরাজনৈতিক আবেগের বিস্ফোরণ। একদিকে প্রখ্যাত ইরানি গায়ক পারভাজ হোমায়ের কণ্ঠে দলের নতুন থিম সংয়ের লাইভ পারফরম্যান্স, অন্যদিকে স্কয়ারে উপস্থিত হাজারো সমর্থকের ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগান এবং হিজবুল্লাহর পতাকা ওড়ানোর দৃশ্য এক অভূতপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। যে দেশের মাটিতে খেলতে যাওয়ার জন্য তারা ব্যাগ গোছাচ্ছেন, সেই দেশের বিরুদ্ধেই স্লোগানে মুখরিত তেহরানের আকাশ! সব মিলিয়ে রাজনীতি, শোক, যুদ্ধবিরতির অস্বস্তি এবং বিশ্বজয়ের স্বপ্নের এক অবিশ্বাস্য কোলাজ হয়ে রইল ইরানের এই বিদায়বেলা।

উজবেকিস্তান বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা করে নিয়ে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মতো এত বড় মঞ্চে খেলতে যাওয়ার আনন্দে রাজধানী তাসখন্দে আয়োজন করা হয় এক বিশাল এবং বর্ণাঢ্য বিদায় সংবর্ধনা।

পুরো স্টেডিয়াম ও রাস্তাঘাট উজবেকিস্তানের পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল। অনুষ্ঠানে দেশের বিখ্যাত কবিরা দেশাত্মবোধক কবিতা আবৃত্তি করেন, যা খেলোয়াড়দের মনে গভীর দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে। জনপ্রিয় শিল্পীদের গান এবং ঐতিহ্যবাহী নাচের মধ্য দিয়ে কোচ ও খেলোয়াড়দের বিশ্বমঞ্চে উড়াল দেওয়ার জন্য শুভকামনা জানানো হয়।

জাপান সুশৃঙ্খল ও আত্মবিশ্বাসী বিদায়

এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি জাপান তাদের দলকে বিদায় জানিয়েছে নিজেদের চিরাচরিত সুশৃঙ্খল ভঙ্গিতে। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক আনুষ্ঠানিক ও গোছানো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘সামুরাই ব্লু’দের বিদায় জানানো হয়। কোনো বাড়তি উন্মাদনা না থাকলেও খেলোয়াড়দের চোখেমুখে ছিল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার দৃঢ় প্রত্যয়।

স্কটল্যান্ড স্বপ্নযাত্রায় অশ্রুসিক্ত বিদায়

ফুটবল আবেগের অন্যতম কেন্দ্রভূমি স্কটল্যান্ডের জন্য এবারের বিশ্বকাপ এক অন্যরকম অনুভূতির। ১৯৯৮ সালের পর, অর্থাৎ দীর্ঘ ২৮ বছর পর তারা আবার বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছে। তাই গ্লাসগো বিমানবন্দরে যখন দলটি মায়ামির উদ্দেশে উড়াল দেওয়ার জন্য পৌঁছায়, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। খেলোয়াড়দের পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং অগণিত ফ্যান তাদের বিদায় জানাতে আসে। বহু পুরনো সমর্থকের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্কটিশদের প্রত্যাবর্তন ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সুন্দর একটি গল্প।

স্পেন রাজকীয় শুভকামনা নিয়ে

ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন দল দেশ ছাড়ার আগে মাদ্রিদে রাজা ষষ্ঠ ফেলিপের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। রাজপ্রাসাদে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অথচ সম্মানজনক অনুষ্ঠানে রাজা স্পেনের পতাকা তুলে দেন।

তুরস্ক লাল উন্মাদনায় ইস্তাম্বুলের

তুর্কি জাতীয় দলের বিদায় ছিল উন্মাদনায় ভরপুর এবং এক কথায় অভূতপূর্ব। প্রথমবারের মতো প্লে-অফের মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করে বিশ্বকাপে আসা দলটিকে বিদায় জানাতে হাজারো সমর্থক লাল পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে আসে। ১০০টিরও বেশি গাড়ির এক বিশাল বহর (কনভয়) দলের বাসকে এসকর্ট করে বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যায়।

ইস্তাম্বুলের রাস্তায় এই কনভয় জাতীয় উৎসবে রূপ নেয়। সমর্থকরা গান গেয়ে, ড্রাম বাজিয়ে এবং গাড়ির হর্ন বাজিয়ে দলকে উৎসাহিত করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বর্ণাঢ্য যাত্রার নাম দেওয়া হয় ‘কনভয় অব ড্রিমস’ (Convoy of Dreams) বা স্বপ্নের বহর, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। তুরস্কের ফুটবল ঐতিহ্য এবং সমর্থকদের নিঃস্বার্থ আবেগ এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

ফ্রান্স প্যারিসের সুগন্ধি নিয়ে যাত্রা

ফ্রান্স দল তাদের বিখ্যাত ‘ক্লেরফন্টেইন’ একাডেমি থেকে প্যারিস হয়ে উড়াল দেয়, যার আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাদের এক বিশেষ নৈশভোজে উজ্জীবিত করেন।

ইংল্যান্ড ইটস কামিং হোম

ইংল্যান্ড দল সেন্ট জর্জেস পার্কে প্রস্তুতি শেষে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স উইলিয়ামের শুভেচ্ছা নিয়ে দেশ ছাড়ে। যথারীতি হিথ্রো বিমানবন্দর মুখরিত ছিল ‘ইটস কামিং হোম’ স্লোগানে। অন্যদিকে, জার্মানি ফ্রাংকফুর্ট থেকে লুফথানসা ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করে। এর আগে শিকাগোর সোলজার ফিল্ডে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ‘কোকা-কোলা সেন্ড-অফ ম্যাচ’-এ তারা ২-১ গোলে জয়লাভ করে নিজেদের প্রস্তুতিটা ভালোভাবে সেরে নেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনাইটেড বাই হোপ

দক্ষিণ আফ্রিকা, যারা ‘বাফানা বাফানা’ নামে পরিচিত, তাদের বিদায় সংবর্ধনা ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ। প্রিটোরিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল গেস্টহাউসে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা জাতীয় দলের সম্মানে এক বিশেষ ‘সেন্ড-অফ ডিনার’ বা বিদায়ী নৈশভোজের আয়োজন করেন। এই আয়োজনের মূল থিম ছিল- ‘United by Hope, Driven by Pride’।

সেনেগাল বিলাসবহুল রাজকীয় ডিনার

আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগালকে বিদায় জানানো হয় এক বিলাসবহুল ডিনারের মাধ্যমে, যাকে অনেকেই রাজকীয় পর্যায়ের আয়োজন বলে বর্ণনা করেছেন। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের এই সম্মাননা তাদের প্রস্তুতি ও মনোবলকে করেছে আরও সুদৃঢ়।

যুক্তরাষ্ট্র জাতিকে গৌরবান্বিত করাই লক্ষ্য

সহ-আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিদায় অনুষ্ঠান ছিল তুলনামূলক ভিন্ন, কারণ খেলা তাদের মাটিতেই হচ্ছে। তবে শিকাগোতে জার্মানির বিপক্ষে তাদের প্রস্তুতি ম্যাচটি ছিল উন্মাদনায় ভরপুর। বিভিন্ন শহরে ফ্যান-ফেস্ট এবং উন্মুক্ত প্রশিক্ষণ সেশনের মাধ্যমে পুরো জাতিকে বিশ্বকাপের আবহে নিয়ে আসা হয়।

মেক্সিকো গানে প্রাণে মুখরিত

মেক্সিকো তাদের জাতীয় দলের জন্য ‘মেক্সট্যুর সেন্ড-অফ’ (MexTour Send-Off) নামে একটি বিশাল কর্মসূচির আয়োজন করে। এর আওতায় ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বাউল স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ৬০ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিল। শুধু ম্যাচই নয়, কনসার্ট এবং উন্মুক্ত অনুশীলনের মাধ্যমে মেক্সিকান সমর্থকরা দলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পায়। মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাকিরা, মানার মতো শিল্পীদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে দিয়েছে বিশ্বজনীন রূপ।

কানাডা বিশ্বকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি

কানাডা টরন্টোতে অনুষ্ঠিতব্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদের বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার বিশাল পরিকল্পনা করেছে। জাতীয় দলের বিদায় অনুষ্ঠানও এই বৃহত্তর উদযাপনের অংশে পরিণত হয়েছে, যেখানে দেশজুড়ে বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রম আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকাপ-উন্মাদনাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com