বিভিন্ন নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও করে রাখতে পছন্দ করতেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া নোয়াখালীর হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন। মোবাইল ফোনে ধারণ করা এসব ভিডিও নিজের ল্যাপটপে সংরক্ষণ করতেন। কিন্তু এসব অশ্লীল কাজকর্ম মেনে নিতে পারতেন না জনৈক কর্মচারী। সুযোগ বুঝে সেই কর্মচারী একদিন ইউএনএরও ল্যাপটপ থেকে প্যানড্রাইভে ভিডিওগুলো সংগ্রহ করেন। পরে ওই কর্মচারী ইউএনওর উপযুক্ত শাস্তির চেয়ে ভিডিওগুলো পরিচিত একজনকে দিয়ে গণমাধ্যমে সরবরাহ করার অনুরোধ করেন। তবে তার আগেই তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে নিজের করে রাখা ভিডিওতে নিজেই ফেঁসে গেলেন আলাউদ্দিন।
এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে তাকে প্রত্যাহার করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে সরকার। ওএসডি করে গতকাল মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইউএনও মো. আলাউদ্দিনের অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল হলে হাতিয়াসহ সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত সোমবার সকালে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকে। পরে একই ধরনের ঘটনার ১০টি ভিডিও দৈনিক আমাদের সময়ের হাতে আসে। তিনি হাতিয়ার ইউএনও হলেও এর ঢেউ এসে লাগে সুনামগঞ্জে। কারণ এর আগে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও শাল্লা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ওই সময় তার বেপরোয়া আচরণ ও অনিয়মের নানা ঘটনা সামনে এসেছে।
তবে প্রচার হওয়া ওই ভিডিওগুলো স¤পূর্ণ ভুয়া বলে দাবি করেছেন ওএসডি মো. আলাউদ্দিন। তিনি নোয়াখালীর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দাবি করেছেন, আগের কর্মস্থলের কিছু বিরোধের জেরে কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে নিয়ে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। বিষয়টি প্রতিহত করতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে সুনামগঞ্জে থাকা অবস্থায় নানা অভিযোগের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার কথা বলতে চাইলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ইতোমধ্যে আলাউদ্দিনের ১০টি অশ্লীল ভিডিও দৈনিক আমাদের সময়ের এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওগুলো ৯ মিনিট থেকে প্রায় ১৮ মিনিটের। এসব ভিডিওতে দেখা গেছে বিভিন্ন বয়সের নারীদের সঙ্গে অসামাজিক কর্মে জড়িত হচ্ছেন। অনেকেই ধারণা করছেন, আলাউদ্দিন পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। কারণ বিভিন্ন বয়সী নারীদের সঙ্গে কাটানো বিশেষ মুহূর্তগুলো নিজেই গোপনে ধারণ করে রাখতেন তিনি।
হাতিয়ার ইউএনও হওয়ার আগে আলাউদ্দিন সুনামগঞ্জের দুটি উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রথমে জেলার সবচেয়ে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সীমান্ত উপজেলা তাহিরপুরে ছিলেন ২০২২ সালে। এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একই জেলার শাল্লায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনওর দায়িত্ব পালন করেছেন। ইউএনও হিসেবে মো. আলাউদ্দিনের অশ্লীল ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জে অনিয়ম-দুর্নীতি ও বদমেজাজি আচরণের খবর প্রকাশ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে তিনি হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
সুনামগঞ্জে নানা অনিয়ম : ইউএনও মো. আলাউদ্দিনের ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃদুল দাস বলেন, ‘আলাউদ্দিন সাব এসিল্যান্ড থাকার সময় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাল ভেবে কোনো ধরনের মাপজোক ছাড়াই আমার রেকর্ডীয় জায়গার ওপর তৈরি করা ওয়ার্কসপের দোকান পর পর তিনবার ভেঙে দিয়েছেন। ঘর ভাঙার কারণে আমার ১০-১২ লাখ টাকার ক্ষতি করেছেন। আমার ব্যবসাটা নষ্ট হয়ে গেছে। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর কারণে কিছু বলতে পারিনি, সব সহ্য করে গেছি। ঘর ভাঙার পর মাপজোক করে জানা গেছে আমার ঘরের জায়গায় সরকারি কোনো জমি নেই। ’
অভিযোগ রয়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন। ভুল আইনি ব্যাখ্যা দেখিয়ে তৎকালীন এক আওয়ামী লীগ নেতাকে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ কয়লা বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তাহিরপুর উপজেলা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর তিনি শাল্লা উপজেলায় সহকারী ভূমি কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন।
২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি দিরাই উপজেলার উদগল হাওরের জয়পুর গ্রামের কাছে বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে বাঁধের ওপর মাটি ফেলার সময় তার (আলাউদ্দিনের) জুতায় কাদা লেপ্টে যাওয়ার অপরাধে জুয়েল মিয়া নামে ট্রলিচালককে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তার ডান কাঁধ ভেঙে দিয়েছিলেন। পরে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। তিনি অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। জুয়েল মিয়া সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নতুন মেঘারগাঁও গ্রামের ইব্রাহিম মিয়ার ছেলে। এ সময় জুয়েলকে বাঁচাতে গেলে মনুরঞ্জন দাস নামের আরেক শ্রমিককে কোদাল দিয়ে আঘাত করেছিলেন তিনি।
শাল্লা উপজেলা সদরের হাসিমিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র মো. ফারুক মিয়া বলেন, ‘মো. আলাউদ্দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতেন। ছোট ছোট দোকানদারকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করতেন। মাদ্রাসার দেওয়াল ভাঙতে না করায় আমাকে ও মাদ্রাসার শিক্ষক মফিজুর রহমানকে হুমকি দিয়েছিলেন। সরকারি জায়গা মনে করে ফায়ার সার্ভিসের সামনে অনেক গরিব মানুষের ঘর-বাড়ি ভেঙে দিয়েছিলেন।’
হাতিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানিয়েছেন, সোমবার সকালে সামাজিক মাধ্যমে তার পর্নোগ্রাফির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কর্মস্থল ত্যাগ করে জেলা সদরের উদ্দেশে রওনা দেন ইউএনও মো. আলাউদ্দিনের। এরপর থেকে তিনি আর কারও ফোন রিসিভ করছেন না। যাওয়ার আগে তিনি অফিসের কাউকে বিস্তারিত কিছু জানাননি। ইউএনও কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তারা শুনেছেন।
এ বিষয়ে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, বিষয়টি তিনি গণমাধ্যম সূত্রে জেনেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। তিনি আরও জানিয়েছেন, ইউএনও মো. আলাউদ্দিনের সোমবার সকালে তার দপ্তরে ছুটির আবেদন জমা দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন।