থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের জনপ্রিয় চাতুচাক জেলায় একটি বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ৬০ জনের বেশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সোমবার দিবাগত রাতের এই দুর্ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চানভিরাকুল। তিনি জানান, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনও তদন্তাধীন। বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টার দিকে এক গাড়িচালক প্রথম বারে আগুন দেখতে পান এবং জরুরি সেবায় খবর দেন। এরপর মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান দমকলকর্মীরা। ততক্ষণে আগুন বারের সামনের প্রবেশপথ ঘিরে ফেলায় ভেতরে থাকা অনেক মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, মঞ্চের কাছাকাছি অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুরো ভবন ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভবন থেকে বিশাল শিখা বেরিয়ে আসছে এবং আতঙ্কিত মানুষ চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুতিন জানান, আগুন লাগার সময় মঞ্চে থাকা এক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। ওই শিল্পীর দাবি, একটি বৈদ্যুতিক কাট-আউট সুইচে আগুন লাগার পরপরই বিস্ফোরণের মতো শব্দ হয় এবং খুব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই ধোঁয়া ও আগুন থেকে বাঁচতে ভবনের পেছনের অংশে থাকা টয়লেটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকেই অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দমকল বাহিনী প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। নিহতদের মধ্যে নয়জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী রয়েছেন।
ব্যাংককের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক সুরিয়াচাই রাভিওয়ান জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু ধোঁয়ায় শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত করা হবে।
ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া মোটরসাইকেল আরোহী সুরিন জাইহার্ন জানান, তিনি অন্তত পাঁচজনকে আগুন থেকে বের হতে সহায়তা করেন এবং তাদের শরীরে লেগে থাকা আগুন কাপড় দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত। অনেক মানুষের মৃত্যু দেখেছি। যাদের উদ্ধার করেছি, তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা জানি না।’
স্থানীয়ভাবে ‘রং বিয়ার না লাত ফ্রাও’ নামে পরিচিত বারটি চাতুচাক জেলায় অবস্থিত। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তোলা ছবিতে ভবনের বাইরে সারিবদ্ধ মরদেহের ব্যাগ এবং পুরো এলাকা পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখতে দেখা গেছে। ভবনের ভেতরের দেয়াল, আসবাবপত্র ও ছাদ আগুনে সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেছে এবং ছাদের কিছু অংশ খসে পড়েছে।
ব্যাংককের গভর্নর চ্যাচার্ট সিত্তিপুন্ট বলেন, বারের ছাদে ব্যবহৃত দাহ্য সজ্জাসামগ্রীর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব উপকরণ থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় অনেক মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।
তিনি আরও জানান, জরুরি বহির্গমন পথের কাছেও কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, টেবিল বা অন্য কোনো আসবাবপত্র ওই পথ আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছিল। তবে বিষয়টি ফরেনসিক তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
থাইল্যান্ডে বারে আগুন লাগার ঘটনা এই প্রথম নয়। চার বছর আগে ব্যাংককের দক্ষিণের একটি শহরের বারে আগুন লেগে ২২ জন নিহত হন। এরও আগে ২০০৯ সালে রাজধানীর একটি নাইটক্লাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৬৬ জন।
এসব ঘটনার পর অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, দেশটিতে নিরাপত্তা বিধি বাস্তবায়নে এখনও নানা দুর্বলতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।