বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ফুলশ্রী গ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য। থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে গ্রামের অধিকাংশ নারী-পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পুরো এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, থানায় হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৪৩ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জন নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
তবে মামলার এজাহারে যাদের আসামি করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, থানায় হামলার পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এজাহারে এমন কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলেই তাদের দাবি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হামলার ঘটনাটি আগৈলঝাড়া থানা-সংলগ্ন বাকাল ইউনিয়নের ফুলশ্রী গ্রামকে কেন্দ্র করে ঘটলেও মামলায় রাজিহার ও গৈলা ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দাকেও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও যুগান্তর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক ও বাংলা টিভির বরিশাল প্রতিনিধি এফএম নাজমুল রিপনের নামও এজাহারে রয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী যুবলীগের আগৈলঝাড়া উপজেলা শাখার সভাপতি কামরুজ্জামান আজাদ সেরনিয়াবাত ও জেলা যুবলীগ নেতা সাগর সেরনিয়াবাতকেও আসামি করা হয়েছে।
দুই সাংবাদিক নেতাকে মামলায় আসামি করার বিষয়টি রহস্যজনক দাবি করে শনিবার (১১ জুলাই) আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবের নেতারা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিষয়টি অবহিত করা হলে, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) উপস্থিতিতে তথ্যমন্ত্রী সুষ্ঠু তদন্ত, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি প্রকৃত হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, থানায় হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওচিত্র ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে যদি দেখা যায় কারও নাম ভুলবশত মামলায় এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি, তাহলে তাকে হয়রানি বা গ্রেপ্তার করা হবে না। বর্তমানে ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়া নাঈম ফকির ঘটনার দিন বাড়িতেই ছিলেন না এবং মিছিল কিংবা থানায় হামলার ঘটনাতেও অংশ নেননি। তারপরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। এ ঘটনার পর থেকেই পুরো ফুলশ্রী গ্রামে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, গত বুধবার সন্ধ্যায় নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে চুরির একটি মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে ফুলশ্রী গ্রামের রিয়াজ ফকিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি লোহার দরজায় নিজের মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পুলিশের দাবি। পরে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সেখান থেকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিকেলে কয়েকশ মানুষ মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায়। এ সময় থানার বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর এবং কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে সংঘর্ষে পুলিশের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
এ ঘটনায় আগৈলঝাড়া থানার এসআই ওমর ফারুক বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় বেআইনি সমাবেশ, দাঙ্গা, সরকারি কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, গুরুতর আঘাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ফুলশ্রী গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকায় গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের নারী-পুরুষ এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি নিরপরাধদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ জাতীয় আরো খবর..