রবিবার, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে দেশে ততই দীর্ঘ হচ্ছে তেলের লাইন। শুধু জ্বালানি তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ আর চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ফলে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার নতুন নতুন উৎস থেকে চড়া দামে জ্বালানি তেল আমদানি করে গত এক মাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও আগামীতে সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যদিও জ্বালানি নিয়ে তীব্র সংকট হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের এই সংকট দূর করতে বিকল্প দেশের দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ নানান কারণে সময়মতো জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না। আবার জ্বালানি আমদানিতে যে বাড়তি অর্থের দরকার তার সংস্থান করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে অবৈধ মজুদও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। জেল-জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না জ্বালানি তেলের কালোবাজারি।

দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এর বেশির ভাগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। যার বড় অংশ আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিও ঝুঁকিতে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। শুরুতে সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি মিলেছে খুব কম। একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির ক্ষেত্রেও।

এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটেও দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করার ক্ষেত্রে অতীতের সেই অভিজ্ঞতা এবারও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলেছে।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার সরকার তা নিচ্ছে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লেও সরকার ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি করেনি।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো সংকট নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও বড় সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।’

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত শুক্রবার চট্টগ্রামে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জ্বালানি যেহেতু ওই অঞ্চল থেকে আসে, তাই সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কোনো আপস করছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার উচ্চমূল্যে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।’

জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত : যুদ্ধ শুরুর পর গত এক মাসে দেশে ১১টি জাহাজে এসেছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টনের বেশি জ্বালানি। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল, ২২ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল।

অন্যদিকে একই সময়ে নির্ধারিত আটটি জাহাজ প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন জ্বালানি নিয়ে দেশে পৌঁছাতে পারেনি। এসব জাহাজে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল থাকার কথা ছিল।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব জাহাজ নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি, সেগুলো নতুন সূচিতে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং বিপিসির বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলেও যুদ্ধের কারণে তাদের কাছ থেকে যথাসময়ে তেল পায়নি বিপিসি। গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামে জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। এ জন্য মার্চে অপরিশোধিত তেলের নতুন কোনো চালান দেশে আসেনি। হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় বুকিং থাকার পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে গত মাসে আসেনি চার জাহাজ এলএনজি। ‘লিব্রেথা’ নামে একটি জাহাজ এলএনজি লোড করার পরও আসতে পারছে না চট্টগ্রামে। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামে আরেকটি জাহাজ এলএনজি লোড করার জন্য হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে টার্মিনালে যেতে পারছে না ।

এই প্রেক্ষাপটে জুন পর্যন্ত একটি প্রাথমিক আমদানি পরিকল্পনা করেছে বিপিসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মে মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল, ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আনার পরিকল্পনা রয়েছে। জুন মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেল, ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন ও ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

এদিকে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গত মঙ্গলবার স্পট ও জিটুজি পদ্ধতিতে দুই লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি কেনার অনুমতি দিয়েছে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

এলএনজি আমদানি : ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব মার্চের পুরোটা সময় থাকলেও এলএনজির চারটি জাহাজ আগেই অতিক্রম করতে পেরেছিল হরমুজ প্রণালি। এর সঙ্গে আগের মজুদ যুক্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে সরকার। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি পার হয়ে একটি জাহাজও আসেনি দেশে। খোলা বাজার থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এপ্রিলের জন্য ৯ কার্গো এলএনজি “বুক” করা হয়েছে। যার মধ্যে ৮ কার্গো খোলা বাজার থেকে কেনা হবে। আশা করছি এ মাসে এলএনজি সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। পাশাপাশি মে মাসের এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি আমদানিতে কোনো সংকট দেখছি না এখন পর্যন্ত। কিন্তু বিকল্প উপায় ও উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধের পর থেকে সরবরাহ সংকটে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি কমপ্লেক্সসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন প্রতি মিলিয়ন ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২০ ডলার গুনতে হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এলএনজি কার্গোর গড় দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০-১১ ডলার।

আরপিজিসিএলের একজন কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ১২টি এলএনজি কার্গো কেনার দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। এপ্রিলের জন্য স্পর্ট মার্কেট থেকে কেনা প্রতি কার্গো এলএনজির পেছনে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ৮০০ থেকে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা, যা আগে ছিল সাড়ে ৩০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে।

ভর্তুকির চাপ বাড়ছে : সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এরমধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এলএনজি আমদানিতে এবং বাকি ৭ হাজার কোটি টাকা যাবে জ্বালানি আমদানিতে, যা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রয়কৃত ডিজেলের বাড়তি খরচ মেটাতে ব্যয় হবে।

আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি ভর্তুকির জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ফলে এখন শুধু এলএনজি খাতেই মোট ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।

এলপিজি : মার্চে ৯টি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে পাঁচটি। বুকিং থাকলেও আসেনি প্রায় তিন লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ।

দেশের বাজারে প্রতি বছর অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। দেশের বাজারে এ গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি করে দেশের বাজারে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বাজারে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। এ পরিস্থিতিতে সংঘাত বিস্তৃত হলে তা দেশের এলপি গ্যাসের বাজারে সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এলপিজির ৭৫ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আমদানির হার ছিল ৫১ শতাংশ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এখন আমদানি কার্যত বন্ধ।

এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চে কিছু এলপিজি আমদানি হয়েছে বটে, তবে এপ্রিলে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে জাহাজ ভাড়া। ফলে বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তা আমদানি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। কারণ, উচ্চ প্রিমিয়ামে এলপিজি আনলেও যদি দাম না বাড়ে, তাহলে লোকসান গুনতে হবে।

কয়েকজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের পর অপারেটররা বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার চেষ্টা করছেন। গুটিকয় জাহাজে এলপিজি এসেছে। সরকারি সংস্থা বিপিসিও আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল। এখন সংকটের এই সময়ে তাদের আরও জোর চেষ্টা থাকা উচিত।

বিপিসি বলছে, গত জানুয়ারিতে বাজারে অস্থিরতার সময় তারা এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিলেও এখনো কোনো সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি। এমনকি দরদামও চূড়ান্ত হয়নি। এলপিজি আমদানির জন্য ৮টি দেশের ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ দেশই সাড়া দেয়নি। ওমান ও ইন্দোনেশিয়া আগ্রহ দেখালেও তাদের প্রস্তাবিত দর বিপিসির প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বেশি ছিল।

জ্বালানি আমদানিতে নানা উদ্যোগ : জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকেও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আফ্রিকার ৯টি দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। এগুলো হলো- আলজিয়ার্স (আলজেরিয়া), কায়রো (মিসর), আদ্দিস আবাবা (ইথিওপিয়া), নাইরোবি (কেনিয়া), ত্রিপোলি (লিবিয়া), পোর্ট লুইস (মরিশাস), রাবাত (মরক্কো), আবুজা (নাইজেরিয়া) এবং প্রিটোরিয়া (দক্ষিণ আফ্রিকা)।

সূত্র জানিয়েছে, পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসে এসব মিশনে চিঠি পাঠিয়েছে। এ মাসের শেষ দিকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং আফ্রিকায় বাংলাদেশের মিশনগুলোর অনলাইনে একটি জুম মিটিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত মাসে নাইজেরিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিয়া মোহাম্মদ মঈনুল কবির আবুজায় দেশটির পেট্রোলিয়াম সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (গ্যাস) একপেরিকপে একপোর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির অনুরোধ জানানো হয়।

এদিকে, আলজেরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজমুল হুদা দেশটিতে পেট্রোলিয়াম আমদানি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মরক্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফাইজুন্নেসাও পেট্রোলিয়াম সরবরাহের নতুন পথ খুঁজছেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় জ্বালানি নিয়ে কঠিন সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরকারকে পুরো বিষয় আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মজুদদারি ঠেকাতে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মতো কিউ আর কোডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যেতে পারে।’

ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় সে জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়; তবে দাম বাড়ানো হলে মুদ্রাস্ফীতির বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আতঙ্কিত হয়ে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পেট্রোল ও অকটেন কিনছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অথচ প্রকৃত সংকটের সম্ভাবনা ডিজেলকে ঘিরেই বেশি।’ অতীতে জ্বালানি মজুদ ও সরবরাহ নিয়ে সরকারের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার কারণে জনগণের আস্থা কমে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com