অন্য ভাষায় :
বৃহস্পতিবার, ০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

এই খাওয়ার শেষ কোথায়

এম জি হোসেন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২২
  • ৫৭ বার পঠিত

‘ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাঘডাশে’। এটি একটি অর্থবহ প্রবাদ বাক্য। নিরীহ হাঁস অনেক আশায় অনেক কষ্টে ডিম দেয়। আর বাঘডাশ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কখন হাঁসের কষ্টের ফসল উদরস্থ করবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রূপকটিতে নিহিত তাৎপর্য এতটাই বাস্তব যে, সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তা ও সংগঠক মাত্রই সেই হাঁসটির মতোই বাঘডাশ আতঙ্কে থাকেনই, তার ওপর বাড়তি আতঙ্ক চাঁদাবাজতো আছেই। চাহিদার তুলনায় এমনিতে বিনিয়োগ স্বল্পতায় ভুগছে দেশ। বিদেশী বিনিয়োগও সব সময় সহজলভ্য নয়, আবার কল্যাণজনকও নয়। দেশে যে সৎ ও সফল উদ্যোক্তার দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে তার সাক্ষ্য ব্যাংকগুলো। ঋণ মানেই খেলাপি আর জালিয়াতি। এহেন বাস্তবতায়ও যারা সুইস ব্যাংকে টাকা না জমিয়ে বা ‘বেগম পাড়ায়’ সেকেন্ড হোম বানানোর চেষ্টা না করে ঝুঁকি নিয়েও দেশে বিনিয়োগ করেন তাদের বিনিয়োগ নিরাপত্তার অভাব বা অনিশ্চয়তার নেতিবাচক প্রভাবে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার সব তৎপরতা নষ্ট হতে পারে। এ লেখা যখন লিখছি তখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি সফরে যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানাতে দেখা গেছে। এর থেকে বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু দেশী বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কে বা অনিশ্চয়তায় রেখে বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন আদৌ কি সম্ভব? কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয়। সুতরাং উদ্যোক্তার মধ্যে এই আতঙ্ক যদি বাসা বাঁধে যে, ‘সরকার পরিবর্তন বা পতন মানে ব্যবসায়ের পতন’ তেমনি অবস্থায় আইন করে অর্থপাচার রোধ কতটুকু সম্ভব?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘বাঘডাশ’ আতঙ্ক দীর্ঘ দিনের হলেও এ বাঘডাশের সব হাঁসের ডিমে আকর্ষণ দেখা যায় না। এখনকার মতো এর সর্বশেষ শিকার মানারাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিল তিল করে যারা এটিকে দাঁড় করিয়েছেন তারা দেশের স্বনামধন্য ধনকুবের তা কিন্তু নয়। শ্রম-মেধা ও সততার মতো উপাদানগুলোই যে এ ক্ষেত্রে প্রধান পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। প্রায় দুই যুগের নিরলস চেষ্টার ফসল দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠানটির যে উজ্জ্বল ভাবমর্যাদা ও পরিচিতি এনে দিয়েছে, হঠাৎই তা বাঘডাশের উদরস্থ হয়ে যাবে তা মানা কষ্টকর। বাঘডাশের শক্তি-ক্ষমতা নিরীহ হাঁসটির চেয়ে অনেক বেশি। তার আছে বড় বড় দাঁত-নখ, গায়ে গতরেও অনেক বড়, সুতরাং ‘জুলুম তার অধিকার’ এটাই যদি হয় বাস্তবতা, তা হলে আদিম যুগটা বোধ করি আমাদের চেয়ে ভালোই ছিল। বেচারা উদ্যোক্তারা নামের সাথে কেন যে ‘ইসলামী’ শব্দটা লাগিয়ে দিয়েছিলেন! তাতেও বোধ করি সমস্যা হতো না। এই যেমন ‘ইসলামিয়া মিষ্টি দোকান’ বা ‘ইসলামিয়া বস্ত্র বিতান।’ তারা নাকি একটু ব্যবহারি ইলাম চর্চার (Practical Islam) ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হওয়ার জন্য আর কী চাই!

সন্তান উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি উন্নত চরিত্র ও মনুষত্বের সমন্বয়ে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক এটি কোনো পিতা-মাতার কাম্য নয়? কিন্তু আমাদের মানুষ গড়ার কারখানাগুলো এই লক্ষ্য পূরণে কতটা প্রতিশ্রুতিশীল? বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যাশার বিপরীত মেরুতে অবস্থানের নজির আশা ভঙ্গের কারণ হয় অভিভাবকের। শত অভাব অনটনেও বুকে জড়িয়ে রাখা মায়ের স্মৃতিময় অলঙ্কার বিক্রয়ের অর্থ, পিতার শেষ সম্বল পেনশনের ক’টি টাকা কোনো নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের জৌলুশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কি খরচ করতে চাইবেন কোনো পিতা যেখানে জ্ঞান চর্চার চেয়ে ‘প্রেম চর্চাই হয় ঢের? সেখানে ভর্তি হওয়া মানেই অবধারিত প্রায় প্রথম বিভাগ, এমন একটি প্রতিষ্ঠান কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর হতে পারে কি প্রথম পছন্দ? মানারাতের ওপর কুনজরের কারণ হতে পারে হয়তো এটাও।

অনেক দিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম বিশেষ প্রয়োজনে। মূল ফটকে একটি বড় আকারের ব্যানার নজরে পড়ল। ইংরেজিতে লিখা ওই ব্যানারের বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আমাদের দাবি প্রেমের অধিকার।’

অবাক হয়ে ভাবলাম ওরা কেন ‘আমাদের দাবি মানুষ গড়ার আঙ্গিনায় মানুষ হওয়ার অধিকার’ এমন কিছু লিখতে পারল না? শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিয়ে ওদের মাথা ব্যথা নেই, বোধ করি এমনটি অনেক কর্তৃপক্ষও চান না। কয়েক পা এগোতেই আর এক ঘটনা। প্যান্ট-শার্ট পরা এক তরুণী আচমকা এক ছাত্রের পাছায় সজোরে থাপ্পড় মেরে বসল। ছেলেটা পেছন ফিরতেই ওর জিজ্ঞাসা, ‘ক্লাসে দেখলাম না যে, প্রেম করতে গিয়েছিস?’ কোমলমতি তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট করার সহজ উপায় হিসেবে আবার অনেকে ‘সহশিক্ষা’ কথাটা বেশ ফলাও করেই প্রচার করেন যেন ওটাই মূল আকর্ষণ।

অনেকের স্মরণ থাকার কথা, মরুহুম প্রেসিডেন্ট এরশাদের সময়ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাঘডাশের কবলে পড়েছিল আর একবার। কে একজন বিবৃতি দিয়ে বসলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের মাদরাসায় দেইনি যে, নামাজ শিখতে হবে, টুপি পরতে হবে।’ টার্গেট স্পষ্ট হয়ে গেলে পরদিন অভিভাবকদের বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের পর ভদ্রলোককে আর কথা বলতে শোনা যায়নি। এই ভদ্রলোকেরাই যখন তাদের সন্তানদের কোনো মিশনারি প্রতিষ্ঠানে পাঠান সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে ক্রুশচিহ্ন ও ধর্মীয় প্রতীকগুলো ধারণের ক্ষেত্রে থাকে না তাদের কোনো আপত্তি। এমনকি আপত্তি থাকে না প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ‘ঋধঃযবৎ’ সম্বোধনেও। ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শনভাবে দেখা যায় একেবারে নীরব। শুধু শিক্ষাঙ্গনই নয়, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল-ক্লিনিক, পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন কোথায় নেই এই ‘বাঘডাশ’ আতঙ্ক? সেই কবে থেকে দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, দৈনিক আমার দেশ বন্ধ। সরকারের ভাষ্য ‘নিষিদ্ধ করা হয়নি। তারা চাইলে চালাতে পারেন’ তার মানে তারা চালাতে চান না? সত্যটা কথার মার প্যাঁচে ঢাকা না অন্য কিছু? সংশ্লিষ্ট হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা বাধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অবস্থাটা কী তা ভাববার মতো হৃদয়ের দেখা মিলল না এত দিনেও? অথচ এরাও এই দেশেরই মানুষ। কোনো কালে কি সব মানুষ এক মতাদর্শে বিশ্বাসী হবে? না কোনো সরকার থাকবে অনন্তকাল? বিদেশী পুঁজি ও উদ্যোক্তা খোঁজার বেলায়তো মত-পথ-দর্শন খুঁজি না, অ্যালার্জি অনুভব করি না কে চায়না, কে জাপানি বা রাশিয়ার। বিদেশী পুঁজির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে দেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে থাকবে না কেন? তাহলে দেশী উদ্যোক্তাদের বেলায় ভেদ-বৈষম্য কেন? এতে হতাশার পাশাপাশি অন্যের শ্রম ও মেধার ফসল ছলে-বলে-কৌশলে গোলায় ভরার ফন্দি-ফিকিরের প্রবণতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক, আর বাস্তবতাও তাই।

যারা ঋণ নিয়ে ব্যাংক খালি করেন তারা সাধারণত আমানত রাখেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ নানা কৌশলে চলে যায় দেশের বাইরে। রাঘববোয়ালদের এসব অপতৎপরতা রাষ্ট্রেরও নজরে পড়ে, তেমন মনে হয় না। আর বাঘডাশ থেকেও এরা থাকে একেবারেই নিরাপদ। চুনো পুঁটিরাই যেন টার্গেট সবার। অথচ আমাদের মতো দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুঁজিই মূলধন গঠনে বড় উৎস। ব্যাংক আমানতের বড় জোগানদারও এরাই। এদের উপেক্ষা করে বা রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে ফেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করা ভিন্ন কোনো কল্যাণ নেই। ব্যবসায়-বাণিজ্য তার নিজস্ব গতিতে চলবে, সরকারের দেখার বিষয় জন-স্বার্থ ও আইনের সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, তা-ও দল নিরপেক্ষ স্বচ্ছ দৃষ্টিতে। সরকারের আর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সুবিধা সন্ধানী অপশক্তি তথা ‘বাঘডাশ’ এর অপতৎপরতা থেকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ হেফাজত করা, ‘বাঘডাশ’ পোষা বা বাঘডাশের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হওয়া নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com