ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি দেশটির হুথি নিয়ন্ত্রিত সব এলাকা পুনর্দখলে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ ঘোষণা দেওয়া হল।
রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে আল-আলিমি বলেন, ‘আজ আমি প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট ভূখণ্ড পুনর্দখল এবং পুরো জাতীয় ভূখণ্ডে রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিচ্ছি।’
এর আগে ইরান-সমর্থিত হুথিরা দাবি করে, তারা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হুথিদের দাবি, গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের ওপর ৫০টি হামলা চালানোর জবাবে এসব হামলা করা হয়েছে। সৌদি আরব অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
হুথি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, রিয়াদ ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ খুরাইস এলাকায় আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, হামলাগুলো লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং আক্রান্ত স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের আগুন ধরে যায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার দাবি নিশ্চিত করেনি।
হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে হুথি-নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন। তাদের দাবি, রোববারের হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। এর আগের দিন ইয়েমেন সরকারও সানা, সাদা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজের কাছে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল।
তাইজ ঘিরে হুথিদের অগ্রগতি
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র তাইজ। শহরটি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রোববার হুথিরা তাইজ থেকে অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করেছে।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে তিন ইয়েমেনি সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হুথিরা ওই এলাকা ও সরবরাহপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে কার্যত তাইজ শহরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি এএফপিকে বলেন, তাইজকে এডেন থেকে বিচ্ছিন্ন করাই হুথিদের সামরিক লক্ষ্য ছিল এবং তারা সেটি অর্জন করেছে, যদিও শহরটির পুরো নিয়ন্ত্রণ এখনো নেয়নি।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার ও জোটের হামলায় রাজধানীসহ সাদা অঞ্চলে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তবে নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, এসব হামলার মধ্যেও হুথিরা বিভিন্ন এলাকায় অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে।
হরমুজের বিকল্প তেলপথ দখল
২০১৪ সালে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু হয়। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং পরে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোট ইয়েমেনের যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।
কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে আবারও যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে।
গত মাসে আকস্মিক অভিযানে হুথিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালির বিকল্প তেল রপ্তানি পথ হিসেবে সৌদি আরবের ব্যবহারের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
হুথিদের এই অগ্রগতি তাদের প্রধান সমর্থক ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। একই সঙ্গে এর ফলে সৌদি আরব আবারও হুথিদের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মানবিক সংকটে রয়েছে। নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে দেশটির বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।