দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভাঙচুরের মতো অপরাধ দমনে কঠোর (হার্ডলাইন) অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। অপরাধীর রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, দেশব্যাপী দখলদার ও চাঁদাবাজদের হালনাগাদ ডেটাবেজ তৈরির পাশাপাশি শিগগিরই সমন্বিত অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অভিযানে পুলিশ, এসআরবি এবং বিজিবির পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত, অপরাধের নেপথ্য হোতা ও আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়েও নীতিগতভাবে কাজ করছে সরকার। দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিটের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর বার্তা দিতে চায় সরকার।
সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় হবে না। অতীতে কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার বিষয়ও আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে ফুটপাত, বাস টার্মিনাল, হাট-বাজার, নদীঘাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও দখলের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা
তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গঠিত টাস্কফোর্স সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধের উৎস ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি নিখুঁতভাবে তদন্ত করবে।
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্সের অধীনে মামলাগুলোর দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের এই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা ধরে রাখা, সাধারণ মানুষের ভয়ের পরিবেশ দূর করা এবং অপরাধমুক্ত দেশ গঠন করা। জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে এমনটাই জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দখল ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই মিরপুরে টিকাদান কেন্দ্র ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একটি স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দখল, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সরকারের নীতিগত জিরো টলারেন্স কার্যকর করার উদ্যোগ, কঠোর আইনগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। সেক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না, বরং সরকার ও সরকারপ্রধানের দৃঢ় বিশ্বাস, রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সহযোগিতায় এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব। এই লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সংলাপ ও সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে শিগগিরই।
এদিকে সরকারের দুজন মন্ত্রী আমাদের সময়কে বলছেন, দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের মূল অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ও আপসহীন। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয় থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ বিচার, আইনের শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান এবং জনস্বার্থ ও নাগরিক নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ। তারা আরও বলছেন, সরকার মনে করে কোনো মন্ত্রী বা নেতার রাজনৈতিক বক্তব্য বা সমঝোতার অজুহাতে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। বিগত দিনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল ভাবনা। ফলে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। যেমন অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্ত আইনি বার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কারণ কেবল অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বেশকিছু পদক্ষেপের ওপর জোর দিতে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বিভিন্ন সেক্টরে ক্ষমতার হাতবদল ও নতুন করে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির যে নেতিবাচক ধারা দেখা গিয়েছে, তা কঠোরহস্তে দমনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার ও সরকারপ্রধান। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ স্বাধীন ও কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুশাসন সমুন্নত রাখতে এবং জনগণের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রতিরোধ পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে বলেও জানান। তিনি বলেন, অপরাধে জড়িত থাকার কারণে দল থেকে বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, তাদের কোনো অপরাধী কর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিলে দল তার দায় নেবে না এবং কোনো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হবে না। কারণ অপরাধের প্রকৃত ঘটনা তদন্তসাপেক্ষে অপরাধীর অপরাধ বিচার নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রত্যয়ী ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
মিরপুর টিকাদান কেন্দ্রের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আমাদের সময়কে বলেন, এত বড় একটা রক্তঝরা বাংলাদেশে এত তাড়াতাড়ি এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হবে এটা তো চিন্তা করা যায় না। সংঘবদ্ধ দল ছাড়া তো কেউ করতে পারে না; তাই এসবের পেছনে কারা আছে এটা যথেষ্ট তদন্ত বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা রাখে। পাশাপাশি এই ধরনের কর্মকাণ্ড একটি নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রও বটে। তাই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। উক্ত ঘটনায় পতিত আওয়ামী লীগ, সংসদে বিরোধী দল যে আছে ওদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তদন্ত করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দখল, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান অন্তরায়। বিগত দিনের ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তরুণ সমাজ ও আমজনতা দেখিয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে একটি নিরাপদ ও চাঁদাবাজমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির ওপর। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা ও নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। তবে এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্ব, রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় প্রতিরোধ ও সহযোগিতা।
এদিকে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা স্বাস্থ্যসেবা সচল করতে এবং জবরদখলমুক্ত রাখতে বেশকিছু পদক্ষেপ ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গায় অবৈধভাবে বসানো ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামক ব্যানার ও সাইনবোর্ড স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে দ্রুত অপসারণ করা হয়। এরপর সেখানে রাড্ডা কেন্দ্রের নিজস্ব সাইনবোর্ড পুনরায় স্থাপন করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা হয়। ব্যাপক ভাঙচুরের ফলে কেন্দ্রের মূল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও খোলা আকাশের নিচে এবং রাস্তার পাশে ত্রিপল টাঙিয়ে শিশুদের টিকাদান ও জরুরি প্রসূতিসেবা চালু রাখতে স্থানীয় বিএনপি সমর্থকরা স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করছেন।
অবশ্য এই হামলায় বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার নাম আসায় একজন যুবদল নেতা আমাদের সময়কে বলেন, ঘটনার সঙ্গে দলীয় কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল এবং অপরাধীকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করতে আমরা পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করে যাচ্ছি।
সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দলীয় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে শনিবারও আক্রান্ত টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শনে যান তিনি। বলেছিলেন, কোনোভাবেই চলমান টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নিয়মিত টিকাদান সেবা পেতে পারেন। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক গত রবিবার ক্ষতিগ্রস্ত টিকাকেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্নিমাণ কাজ দলীয় ও সরকারি উদ্যোগে দ্রুত শুরু করা হবে বলেও ঘোষণা দেন।