মঙ্গলবার, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

এলপিজির বাজারে আবার অস্থিরতা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত

দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকার পরও খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামে মিলছে না ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করলেও বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও দুর্ভোগ।

রাজধানীর বিমানবন্দর-আশকোনা এলাকার বাসিন্দা গোলাম সাত্তার রনি বলেন, ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারিত দামের সিলিন্ডার তাকে ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। খুচরা দোকানদারের কাছে বাড়তি দামের কারণ জানতে চাইলে সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে বলে জানানো হয়। এ ধরনের অভিযোগ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ বিভাগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে এলপিজি খাতের ব্যবসায়ীরা বৈঠক করে একই অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ আছে। তবে দাম বৃদ্ধির যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেটা খুচরা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ওমেরা এলপিজি কোম্পানির মালিক ব্যবসায়ী আজম জে চৌধুরী। তার কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বাজারে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত এলপি সরবরাহ আছে। খুচরা পর্যায় দাম বৃদ্ধি যে অভিযোগ সেটা মূলত খুচরা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে। তবে তিনি বলেন, সামনের দিকে এলজি সংকট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক নয়। আগে যেখানে সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) ছিল ১৬০ ডলার সেখানে এখন ৪৫০ ডলার চাওয়া হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সামনের দিকে এলপিজি আমদানিতে খরচ অনেক বেশি পড়বে। দামও অনেক বাড়বে। তিনি বলেন, আবার সেটা নাও হতে পারে। আগে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে এলপি আমদানি করতে হতো এখন সেটা ইউএস মার্কেট থেকে আমদানি করতে হয়। আমরা বিইআরসিকে বলেছি একটা ডায়ানামিক প্রাইস ফর্মুলা নির্ধারণে কাজ করতে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে দাম বাড়লে বাড়ে, আবার কমলে কমে। বিইআরসি যদি সেটা করে তবে দাম বাড়লে দাম বাড়বে, কমলে কমবে। তবে এ ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ আমাদের এখানে বৃহৎ আকারে মজুদ বা সংরক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের ওপর নির্ভর করে আমদানি ও সরবরাহ করতে হয়। অনেক বেশি মজুদ সক্ষমতা থাকলে তখন হয়তো বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত।

গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎ বিভাগের কনফারেন্স রুমে বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক হয়। বৈঠকের বিষয় ছিল এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়। আলোচনায় বলা হয় দেশে এলপি গ্যাসের (এলপিজি) সার্বিক জোগান ও মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকা সত্ত্বেও খোলাবাজারে নিয়ন্ত্রিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আলোচনা সভায় এলপিজি অপারেটররা মন্ত্রীকে দেশে কোনো এলপিজি সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করেন। বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত বিইআরসি মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০০-৫০০ টাকা বেশিতে বিক্রির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের সঙ্গে দেশের বাজারের পার্থক্যের কারণেই খুচরা পর্যায়ে এমন বাড়তি দাম দেখা যাচ্ছে।

গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সভায় দেশের বর্তমান এলপিজি আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও বাজারদর পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে এলপিজি খাতের মূল উপাত্ত ও তথ্য তুলে দেওয়া হয়। এ খাতের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধির বিষয়ে বলা হয় বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৭-১৮ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের এলপিজি বাজারে বার্ষিক চাহিদা বা প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৬তম।

খাতভিত্তিক ব্যবহার উল্লেখ করে দেখানে হয় দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে (গৃহস্থালি)। এ ছাড়া শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ১২ শতাংশ, যানবাহনে (অটোগ্যাস) ৫ এবং অন্য খাতে ৩ শতাংশ এলপিজি ব্যবহৃত হয়।

বেসরকারি নির্ভরতা : দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৯৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি খাত, আর সরকারি খাতের অংশ মাত্র এক দশমিক ৩৩ শতাংশ।

সাম্প্রতিক আমদানিচিত্র : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উপাত্ত অনুযায়ী, গত আগস্ট ২০২৬ মাসে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০.১৪৫ মেট্রিক টন এবং চলতি সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে (২২ তারিখ পর্যন্ত) এক লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ দশমিক ৬২৪ মেট্রিক টন এলপিজি বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে মোট আমদানি অনুমোদনের পরিমাণ ছিল চার লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৪.৩৭৯ মেট্রিক টন।

সভায় এনবিআর ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য পেশ করে অপারেটরগণ জানান, দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি বা সরবরাহ সংকট নেই। তবে বাস্তব চিত্রে ভিন্ন রূপ দেখা যাচ্ছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য এক হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে খুচরা বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে একই ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে ২১শ টাকায়।

বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহের ঘাটতি বা কৃত্রিম চাপের কথা বলা হচ্ছে (প্রায় ৩০ শতাংশ কম সরবরাহ)। ব্যবসায়ী ও অপারেটরদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দর বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশি বাজারে। তবে গ্রাহকদের পছন্দের ব্র্যান্ড না পেয়ে অন্য ব্র্যান্ডে সুইচ করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

সভায় জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারে যেন কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়। অসৎউদ্দেশ্যে কোনো পক্ষ যেন মজুদদারি করে জনদুর্ভোগ না বাড়ায়, সে ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক ও আমদানিসংক্রান্ত যেসব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দ্রুত সমাধানে জ্বালানি বিভাগকে নির্দেশ দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এলপিজি আমদানির সব বাধা দূরীকরণে মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা দিবে। অপারেটররাও বাজার স্বাভাবিক রাখতে এবং সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করতে অঙ্গীকার প্রকাশ করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com