বুধবার, ০১:৪৭ অপরাহ্ন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

প্রজ্ঞাপন ছাড়াই বাড়তি বাসভাড়া আদায়

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি কিলোমিটারে বাসের ভাড়া ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ। দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা।

গতকাল সচিবালয়ে নতুন বাসভাড়া নির্ধারণ নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে পরিবহন মালিক পক্ষের বৈঠক হয়। বৈঠকে সরকার ও পরিবহন মালিক পক্ষ প্রতি কিলোমিটার ১৭ পয়সা করে ভাড়া বৃদ্ধির ব্যাপারে একমত হয়। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। অথচ এর প্রভাব এরই মধ্যে রাজপথে দৃশ্যমান। দূরপাল্লার বাসযাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন ট্রাক-পিকআপের মালিকরা। প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারেও। গত রবিবার সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। সড়ক পরিবহনের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পারিবারিক ব্যয়ের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতির উচ্চ চাপের মধ্যেই থাকা মানুষের ব্যয়ের বোঝা আরও বাড়বে।

গতকাল সকাল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে সরেজমিন দেখা যায়, দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে গন্তব্যভেদে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এসি ও নন-এসি দুই ধরনের বাসেই বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল।

কুষ্টিয়ার যাত্রী মো. রমজান জানান, আগের দিন ঢাকায় আসতে তিনি ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন একই যাত্রার জন্য তাকে আরও ১০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক চাপ এসে পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।

ঢাকা থেকে নোয়াখালীর মাইজদী রুটে জনপ্রতি বাসভাড়া ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পরিবার নিয়ে নোয়াখালী যাওয়ার সময় শামসুল আলম নামের এক যাত্রী বলেন, দুই দিন আগেও ৬০০ টাকা করে দিয়ে এসেছি। আজ (গতকাল) ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছে। এক টাকাও কম রাখছে না। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটেও যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সিলেটগামী ইমরান নামের এক যাত্রী বলেন, দুই মাস আগে ৫০০ টাকা দিয়ে সিলেট থেকে ঢাকায় এসেছি। আজ ৬০০ টাকা দিয়ে বাড়ি যেতে হচ্ছে। আমি সিলেট শহর পর্যন্ত যাব না, তারপরও ৬০০ টাকার নিচে টিকিট পাচ্ছি না।

ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালেও যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতি টিকিটে অন্তত ৫০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সকালে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের টিকিট ক্রয় করেন হোসনে আরা বেগম। সঙ্গে তাঁর মেয়ে ছিলেন। তাঁরা গোপালগঞ্জ যাচ্ছিলেন। ননএসি বাসের দুটি টিকিট হোসনে আরা কেটেছিলেন ১ হাজার ১০০ টাকায়। তিনি জানান, আগে প্রতি টিকিট রাখা হতো ৫০০ টাকা। তিনি জানান, ‘কোনো বাসে কম নেই। সবাই ৫০ টাকা করে বাড়তি নিচ্ছে।’

আন্তঃজেলা বাস ছাড়াও রাজধানীর মধ্যে চলাচলকারী বাসেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সায়েন্সল্যাব থেকে সাভার পরিবহনের বাসে রায়সাহেব বাজারে আসা মিজানুর রহমান জানান, আগে যেখানে ২০ টাকা ভাড়া দিতেন, সেখানে মঙ্গলবার ২৫ টাকা চাওয়া হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাসের কর্মীদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটিও হয়।

নতুন বাজার থেকে ভিক্টর পরিবহনের বাসে গুলিস্তানে আসা আফতাব আহমেদ জানান, তার কাছ থেকে নির্ধারিত ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ৮ পয়সা, সিটি সার্ভিসে ১০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব যাত্রী কল্যাণ সমিতির : দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ৮ পয়সা, সিটি সার্ভিসে ১০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে লঞ্চের ভাড়া প্রতি নটিক্যাল মাইলে ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি।

বেড়েছে কিছু পণ্যের দাম : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার একদিন না পেরোতেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নতুন করে আসা পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি।

গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ১০০-১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগের দিন এর দাম ছিল ৯০-১০০ টাকা। শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে, যা আগের দিন ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ঢ্যাঁড়শ ৬০-৭০, মুখিকচু ৬০-৮০, টম্যাটো ১০০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১০০-১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।

ফার্মের লাল ডিম প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা পর্যন্ত, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ৫০ টাকা। আমদানি করা রসুন ১৮০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পিঁয়াজ আগের দরেই কেজিতে ৫০-৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মুদি পণ্যের বাজারে মোটা মসুর ডাল ৯৫-১০০, চিকন মসুর ১৬০ টাকা কেজি, খোলা আটা ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকা লিটার দরে। এসব পণ্যের কয়েকটির দাম আগের তুলনায় ২-১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

মিরপুর-১১ নম্বর বাজারের আনোয়ার হোসেন নামে এক সবজি বিক্রেতা বলেন, আজকে যে সবজি এনেছি, সেটার ভাড়া আগের চেয়ে বেশি পড়েছে। তাই কিছু পণ্যে দাম একটু বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু একদিনে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। পাইকারি বাজার থেকে যে দামে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপরই আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (কার্যক্রম বিভাগ) আতিয়া সুলতানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে অধিদপ্তর সতর্ক রয়েছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বাজারে নজরদারি করা হচ্ছে। অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে কিংবা মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না : বাণিজ্যমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং পণ্যের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গতকাল দুপুরে সিলেটে চা-শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। তবে বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিতভাবে জ্বালানির দাম সমন্বয় করায় মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের কাছে আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে যাতে অন্য পণ্যের ওপর প্রভাব না পড়ে, মূল্যস্ফীতি না বাড়ে এবং সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য সরকার কাজ করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সরবরাহব্যবস্থার কোথাও অসঙ্গতি তৈরি হলে তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়তে পারে। এ কারণে সরকার সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, দুই দিন আগেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমদানিকারক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে একটি বড় সভা হয়েছে। সেখানে পণ্য আমদানি, পরিবহন ও বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, চিনি ও সয়াবিনসহ যেসব আমদানি করা পণ্য দেশে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেসব কারখানা এখন পূর্ণ উদ্যমে উৎপাদন করছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com