বরিশালের গৌরনদীতে আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া গেলেও তার পা হাঁটু পর্যন্ত মেঝেতে ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাত ৩টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন পেয়ে গৌরনদী পৌরসভার টরকী বন্দর ছাগলহাটা এলাকার একটি ভাড়াবাসা থেকে মোমেনা বেগম (২৪) নামের ওই গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিক হাসান রাসেল। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্তে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
নিহত মোমেনা বেগম ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভার কানারামপুর গ্রামের মো. আব্দুল্লাহ মিয়ার মেয়ে। পরিবারের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে বসবাস করতেন। সেখানে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রমজানপুর গ্রামের সোহাগ রাঢ়ীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং প্রায় তিন বছর আগে দুবাইয়ে তাদের বিয়ে হয়।
স্বজনরা জানান, মোমেনা বর্তমানে আড়াই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। প্রায় ১৫ দিন আগে স্বামী সোহাগ রাঢ়ী তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন। এরপর থেকে তিনি টরকী বন্দরের ছাগলহাটা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় শাশুড়ি, দেবর ও জায়ের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। তার জা দিনা বেগম সম্পর্কে আপন ছোট বোন।
মোমেনার ছোট বোন দিনা বেগমের দাবি, বাংলাদেশে আসার পর থেকেই তার স্বামী সোহাগ মোবাইল ফোনে মোমেনাকে তালাক দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিন সোমবার বিকেলে জরুরি প্রয়োজনে তিনি বাসার বাইরে যান। রাতে ফিরে এসে মোমেনার কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান।
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জানান, রাত ১২টার দিকে মোমেনার স্বামী সোহাগ বিদেশ থেকে তাকে ফোন করে মোমেনার কক্ষের দরজা বন্ধ থাকার কথা জানান এবং বাসায় গিয়ে বিষয়টি দেখতে বলেন। পরে তিনি আরও একজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় যান। সেখানে মোমেনার কক্ষের দরজা বন্ধ দেখতে পান। পরে বাসায় থাকা মোমেনার দেবর রাহাত রাঢ়ী (১৭) ও তার মায়ের সহযোগিতায় দরজা ভাঙা হয়।
জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, দরজা ভাঙার পর কক্ষের জানালার গ্রিলের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় মোমেনাকে দেখতে পান তারা। তবে তার দুই পা হাঁটু পর্যন্ত মেঝেতে ছিল। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
এদিকে মোমেনার বাবা মো. আব্দুল্লাহ মিয়া দাবি করেছেন, তার মেয়ে আত্মহত্যা করেননি। তার অভিযোগ, ছোট মেয়ে দিনা বেগম বাসায় না থাকার সুযোগে মোমেনার স্বামী সোহাগের প্ররোচনায় তার ছোটভাই ও মা মিলে মোমেনাকে হত্যা করেছেন। পরে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল্লাহ মিয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গৌরনদী মডেল থানার ওসি মো. তারিক হাসান রাসেল বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোমেনা বেগমের শাশুড়ি ও দেবরকে থানায় আনা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।
পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মোমেনা বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..