মঙ্গলবার, ০৯:২৪ অপরাহ্ন, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

সিস্টেম লসে বছরে ক্ষতি ৬ হাজার কোটি টাকা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার পঠিত

গ্যাসের তীব্র সংকটে যখন শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চাপে পড়েছে, তখন বিতরণ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সংযোগ ও জরাজীর্ণ পাইপলাইনের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার গ্যাস সিস্টেম লসে হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে চুরি, লিকেজ ও দুর্বল তদারকির কারণে জাতীয় সম্পদের বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনাও কাক্সিক্ষত ফল দিতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় সিস্টেমলস কমাতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান নয়; অবৈধ সংযোগ বৈধ করার বাস্তবসম্মত নীতি, পুরনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, আধুনিক মিটারিং এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে গ্যাস সংকট ও হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। সরকারের বিশেষ ‘১৮০ দিনের পরিকল্পনা’ নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জ্বালানি বিভাগ।

সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভার সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের সিস্টেম লস বা চুরির বিষয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সিস্টেম লসের বড় অংশই অনুমোদিত কারিগরি ক্ষতির বাইরে, যা মূলত অবৈধ সংযোগ, গ্যাস চুরি ও তদারকি দুর্বলতার ফল।

বছরে ক্ষতি ৬ হাজার কোটি টাকা : বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রতি হাজার ঘনফুট (এমসিএফ) গ্যাসের সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৬৯০ টাকা ৪৪ পয়সা। জ্বালানি বিভাগের তথ্য

অনুযায়ী, বর্তমানে মোট সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ৩৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর আর্থিকমূল্য প্রায় ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। পুরো বছর একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। তবে এই পুরো ক্ষতিকে কারিগরি ক্ষতি বলা যায় না। কারণ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাস বিতরণে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস অনুমোদন করে।

অর্থাৎ বর্তমান ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ সিস্টেম লসের মধ্যে অনুমোদিত ২ শতাংশ বাদ দিলে অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশই মূলত অবৈধ সংযোগ, চুরি, লিকেজ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।

সভায় অসন্তোষ, টার্গেট পূরণ অসম্ভব : জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে একটি সভা হয়। সভায় জানানো হয়, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সিস্টেম লস কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান অগ্রগতিতে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। জ্বালানি বিভাগের উপসচিব (অপারেশন-৪) সভায় বলেন, বর্তমান বাস্তবায়ন অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে যাবে। সভায় জানানো হয়, একমাত্র গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল) নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জানানো হয়। কিন্তু তিতাস নির্ধারিত ৫ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তো দূরের কথা, বরং তাদের সিস্টেম লস আরও বেড়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতেও দেখা গেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) সভায় বলেন, ওয়াশিং ফ্যাক্টরি ও চুন কারখানাগুলোয় অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। শুধু নেটওয়ার্ক আইসোলেশন করলেই হবে না, অবৈধ গ্রাহকদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে সিস্টেম লস কমবে না। একই বৈঠকে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) সভায় বলেন, সরকারের লক্ষ্য সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু বর্তমানে তা ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে রয়েছে। এ জন্য আইসোলেশন কার্যক্রম জোরদার, জোনভিত্তিক জবাবদিহি এবং পুরস্কার-শাস্তি ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিতে তিতাস : পেট্রোবাংলার প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভলিউমের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস হয়েছে তিতাসে। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লস বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সভায় তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বড় শিল্প গ্রাহকদের অংশে সিস্টেম লস তুলনামূলক কম। তবে অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজ এবং আবাসিক খাতের কারণে ক্ষতি বাড়ছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও মুন্সীগঞ্জে এখনও হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ সক্রিয় রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক জায়গায় নতুন করে সংযোগ নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এত বড় পরিসরে অবৈধ সংযোগ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

পুরনো পাইপলাইনও বড় সমস্যা : অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি পুরনো পাইপলাইনের লিকেজও সিস্টেম লস বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৭০ কিলোমিটার পাইপলাইনে জরিপ চালিয়ে তিতাস ৯ হাজার ৩৮৪টি লিকেজ শনাক্ত করে। বিপরীতে একই সময়ে জালালাবাদ গ্যাসে ১১৮টি, কর্ণফুলীতে ১১টি, বাখরাবাদে তিনটি এবং জিটিসিএলের সঞ্চালন লাইনে মাত্র দুটি লিকেজ পাওয়া যায়। এই লিকেজগুলো দিয়ে সারাক্ষণ গ্যাস বের হয়ে সিস্টেম লস আরও বাড়াচ্ছে।

ব্যর্থ হলে পদোন্নতি বন্ধ : পরিস্থিতি মোকাবিলায় সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পৃক্ত করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ক্ষতি তুলে ধরে জনসচেতনতামূলক টেলিভিশন প্রচারচিত্র তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলোÑ জোনভিত্তিক কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু করা। যারা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবেন, তারা পুরস্কৃত হবেন। আর যারা ব্যর্থ হবেন, তাদের পদোন্নতি বন্ধ, বেতন বৃদ্ধি স্থগিতসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান হবে না। অবৈধ সংযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পুরনো পাইপলাইন দ্রুত প্রতিস্থাপন, আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা চালু এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার এই জাতীয় সম্পদের অপচয় বন্ধ করা কঠিন হবে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমাদের সময়কে বলেন, তিতাস সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ এলাকা। অবৈধ গ্যাস সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো অবৈধ গ্যাস সংযোগ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মানুষ যদি সচেতন না হয়, নিজেদের দায়বদ্ধ না মনে করে অভিযান চালিয়ে হয়তো সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, তিতাস এলাকায় যদি বেশি গ্যাসের সরবরাহ থাকে তখন সিস্টেম লস বেশি হয়। কারণ তখন গ্যাসের প্রেসারে ছিদ্র পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে যায়। তিনি বলেন, সিস্টেম লসের সবটা চুরি এমন বলা যাবে না। জরাজীর্ণ পুরনো পাইপলাইন একটা বড় কারণ।

এদিকে পেট্রোবাংলার এক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, গ্যাসের অপচায় বন্ধ করে যদি রাজস্ব বাড়াতে হয় তবে সরকারকে পলিসি বদলাতে হবে। তিনি বলেন, লাখ লাখ অবৈধ আবাসিক সংযোগ। প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোনোদিনও এসব সংযোগ বন্ধ করা যাবে না। তবে সরকার যদি একেবারে নতুন গ্যাস সংযোগ নাও দেয় কিন্তু যাদের আগে থেকে সংযোগ আছে তাদের চুলা বৃদ্ধির পারমিশন দেয় তবে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। আবার নতুন করে গ্যাসের বরাদ্দও দরকার হবে না।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে যারা ব্যবহার করছে তারা বৈধ হয়ে সরকারকে বিল পরিশোধ করবে। কিন্তু সরকার নতুন সংযোগ, চুলা বৃদ্ধি সব কিছু বন্ধ করে রাখার কারণে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধভাবে গ্যাসের ব্যবহারও বন্ধ করতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, তবে অনেক শিল্প কারখানায় অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার আছে, সেগুলোয় জোরালো অভিযান চালানো যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সফল হতে হলে সরকারকে প্রথমেই রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। কারণ যারা শিল্প মালিক তাদের অধিকাংশই প্রভাবশালী। সরকারের মন্ত্রী, সাংসদসহ নানাভাবে ঘনিষ্ঠ। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিতরণ কোম্পানিগুলো অভিযান চালাতে গেলে উল্টো নাজেহাল হয়ে ফিরতে হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com