সোজা ভাষায় সবার মনে একই প্রশ্ন। তবে উত্তর সবাই আশা করে একটাইÑ একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, ত্রুটিমুক্ত সবার গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হতেই হবে। এটা এখন আর কারও পছন্দের পর্যায়ে নেই, এটা এখন দেশের জন্য আবশ্যিক। হতে হবে এমন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যার মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থা একটি অর্থবহ, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে পারে, এটাই এখন জাতির প্রত্যাশা। নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে, প্রার্থীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে দিয়েছে একের পর এক। দলগুলোর নেতারা দিনের পর রাত এক করে নিজেদের এবং দলীয় প্রার্থীদের সহায়তায় প্রচারণার জন্য প্রায় পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন, গণসংযোগ করেছেন নানাভাবে নানা প্রকারে, যার যার নিজস্ব চিন্তাভাবনা দিয়ে। বিশেষভাবে তারা সবাই প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, যেটা মোটামুটি সবাই জানে এবং বুঝে, সম্পূর্ণভাবে এই প্রতিশ্রুতি পরিপূরণ করা সম্ভব হওয়া কঠিন হবে। বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সুযোগ ও সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। তাদের মনে এমন প্রশ্নও এসেছেÑ পরবর্তীতে এই প্রতিশ্রুতি, প্রতিজ্ঞা এবং আশাবাদ পূরণ না করা হলে একমাত্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছাড়া অন্য কোনো পন্থা থাকবে কিনা। কতটুকু আস্থার সঙ্গে তারা এবার রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং প্রার্থীদের ওপর নির্ভর করতে পারবেন?
দেশের তরুণ ভোটার, যারা পূর্বে ভোটার হয়েও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি এবং যারা এবার প্রথম ভোটার হয়েছেন, তাদের জন্য সেই সুযোগ থাকবে কিনা, নিরাপদে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবেন কিনাÑ নানা প্রশ্ন ভোটারের মনে অস্বস্তি জায়গা করে নিচ্ছে। সংখ্যালঘু বা বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণে কিংবা সম্পূর্ণ নিরাপত্তা থাকবে কিনা, সেখানেও কিছু কিছু সন্দেহ আছে। দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী থাকায় তাদের ভোট প্রদান এবার ভীষণভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের জন্য শতভাগ নিরাপত্তা না থাকলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা রাজনীতি করে, তাদের প্রভাব, নারীদের সম্মান প্রদর্শনের কথা বলে কোনো না কোনোভাবে অধিকার হরণ, নারীদের মৌলিক অধিকার হরণ হতে পারেÑ এমন সব বক্তব্য যেটা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিডিয়াতে এসেছে এবং মোবাইলের মাধ্যমে এসেছে। নারীদের চিন্তিত করেছেÑ এমন সব নানা বিষয় নির্বাচন নিয়ে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, সেটা জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
এখন ভাবনার বিষয় নির্বাচন কেমন হবে?
যারা নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন এবং আছেন, যারা দেশবাসীর কাছে দায়বদ্ধ, যাদের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত যাচ্ছে অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন, তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, তাদের ন্যায়পরায়ণতা, তাদের নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনে কোনো অজানা গোষ্ঠী বা বিভিন্নভাবে ক্ষমতাধারী গোষ্ঠীর চাপ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার দৃঢ়তা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেবে না বলে আমাদের বিশ্বাস।
দেশকে যারা দুর্নীতিমুক্ত করতে চান, আইনের শাসন যারা প্রতিষ্ঠিত করতে চান, শহরের গণ্ডির বাইরে যারা সমগ্র বাংলাদেশের কথা ভাবেন; এই নির্বাচন ঘিরে তাদের কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করবে, তারা ভোট পাওয়ার যোগ্য কিনা, তাদের হাতে শাসনভার ন্যস্ত করা যাবে কিনা। এখনও দুই দিন আছেÑ দেশের লুট হওয়া সম্পূর্ণ অস্র উদ্ধার করা হয়নি, সম্পূর্ণ প্রশাসন নিরপেক্ষ করা গেছে, এটাও বলা যাবে না, অনেকে যারা সত্যিকার দেশকে ভালোবাসে না, নির্বাচনকে বানচাল করতে চায় বা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের ব্যাপারেও অনেকের মধ্যে আশঙ্কা বিরাজ করছে। প্রায় ১৫ থেকে ১৭ বছর এক দলের শাসনের পর প্রশাসনের পক্ষে যারা নির্বাচনে যুক্ত হবেন, তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মনোভাব কতটুকু পাওয়া যাবে, সেখানেও পর্যবেক্ষণের দরকার হবে।
ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে থেকে যে শততার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের দরকার, সেই রকম পর্যবেক্ষণের রিপোর্ট এখনও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারের দরকার ছিল, এ ক্ষেত্রেও কিছুটা অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্তত সাত দিন আগে ও পরবর্তীতে অন্তত তিন দিন দক্ষ/অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন কতটুকু পূরণ হবে আমার জানা নেই। পর্যবেক্ষকরা হচ্ছেন ওয়াজডগ, তাদের দৃশ্যমান অবস্থান অনেক অনিয়মকে বাধাগ্রস্ত করে। নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক দল নিয়োগ ও অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আস্থা রাখা যায়নি। সব মিলিয়ে নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু করার প্রক্রিয়ায় সফল হতে দরকার হবে সব স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতা, সদিচ্ছা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপর দৃঢ় আস্থা।
কতটুকু পারা যাবে, সেটা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। সেই সঙ্গে যোগ করি আরও দায়িত্বশীল একটি সংগঠনের কথাÑ যেটা হচ্ছে মিডিয়া। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, যেখানে তাদের ভূমিকা পালন করে এসেছে, সেখানে প্রার্থীদের পরিচিতির ব্যাপারে তাদের আরও একটু পরিকল্পনামাফিক তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা থাকলে ভোটাররা উপকৃত হতেন। এখন যেখানে প্রচারণা করার সুযোগ নেই সেখানে গোপনে অর্থ, শক্তি ও ম্যানিপুলেশন ব্যবহার হয়, সেদিকে তাদের পর্যবেক্ষকদের বলিষ্ঠ দায়িত্ব থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনের সহায়ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আমি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ন্যস্ত করছি জনগণ, ভোটারের ওপরÑ তাদের অধিকার রক্ষা তাদেরই দায়িত্ব।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও প্রেসিডেন্ট, ফেমা