সোমবার, ১২:২২ অপরাহ্ন, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

নেপালে গণকবরের সারি : শত শত অজ্ঞাত মরদেহে ভারী চিতওয়ান

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও উদ্ধার হচ্ছে একের পর এক মরদেহ। অনেক মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এসব অজ্ঞাত মরদেহের অস্থায়ী সমাধিস্থলে পরিণত হয়েছে পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত চিতওয়ান জেলার দেবঘাট বন।

বন্যায় বিধ্বস্ত রাসুয়া উপত্যকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের সমতল এলাকায় অবস্থিত এই বন আগে সকালে হাঁটাহাঁটির জন্য জনপ্রিয় ছিল। আর এখন সেখানে দ্রুত পচে যাওয়া অজ্ঞাত মরদেহ সমাধিস্থ করতে শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে।

চিতওয়ানের বারাতপুরের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

শনিবার দেবঘাট বনে ৯৬টি শনাক্ত না হওয়া মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও ১০০টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। এদিকে নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজও অব্যাহত রয়েছে।

হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলোতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ।

মৃতদের শনাক্ত করতে প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারি কর্মী কাজ করছেন। তারা মরদেহের ছবি তুলছেন, স্বজনদের শনাক্তকরণে সহায়তা করছেন এবং সমাধিস্থ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি কবরের অবস্থান সতর্কতার সঙ্গে নথিভুক্ত করা হচ্ছে। কবরের ওপর ও মাটির নিচে পরিচয়-চিহ্ন রাখা হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট অবস্থানও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো পরিবার দাবি করলে, সরকারি নথি বা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজন হলে কবর থেকে তুলে নেওয়া যাবে।

অজ্ঞাত মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। ভারত ইতোমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে, যারা নেপালের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ডিএনএ বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও সমন্বয় করছে নেপাল।

হাসপাতালের মর্গে মরদেহের স্তূপ

চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের অস্থায়ী মর্গের প্রায় ২০০ মিটার দূর থেকেই পচনশীল মরদেহের দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

দুর্ঘটনায় উদ্ধার হওয়া প্রায় ১২৫টি মরদেহ মর্গের ভেতরে রাখা হয়েছে। অথচ হাসপাতালের মর্গটি সর্বোচ্চ ৫০টি মরদেহ রাখার উপযোগী। কয়েক দিন পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহে পচন এতটাই ধরেছে যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা পরিদর্শক অনিল থাপা বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহের অর্ধেকেরও বেশি শনাক্তের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অনেকের মুখও আর চেনার মতো নেই।

মরদেহ সামলাতে থাকা কর্মীদেরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। থাপা বলেন, কর্মস্থলে আসার পর খাবারের কথা তো দূরের বিষয়, পানি পান করতেও তার ইচ্ছা করে না।

স্বজনদের অপেক্ষা, প্রিয়জনের খোঁজে ভিড়

চিতওয়ান এক্সপো সেন্টার এখন নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে আসা পরিবারগুলোর প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানে দুই শতাধিক মানুষ জড়ো হয়েছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বজনদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে।

অনেক পরিবার দূরবর্তী জেলা থেকে ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে সেখানে পৌঁছেছে। কেউ কেউ আগের দিন এসে পৌঁছালেও তাদের এখনো শনাক্তকরণ হলে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন।

এর কাছেই একটি পুরোনো একতলা বাড়িকে মরদেহ সংরক্ষণের অস্থায়ী কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। বাইরে রয়েছে নেপাল রেড ক্রসের সহায়তা ডেস্ক ও পুলিশের নিবন্ধন কেন্দ্র। দুর্গন্ধ কমাতে সেখানে ধূপ জ্বালানো হলেও তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না।

ভেতরের কক্ষগুলোতে খাটের ওপর সারি সারি বডি ব্যাগ রাখা হয়েছে। পচন ধীর করতে দরজার কাছে শুকনো বরফ রাখা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক এয়ার কন্ডিশনার ও শিল্প-মানের কুলিং ইউনিট চালানো হচ্ছে।

উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই একপর্যায়ে ১৩টি মরদেহ নিয়ে একটি গাড়ি সেখানে পৌঁছায়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে কেন্দ্রটির বাইরে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। আরও একটি গাড়ি মরদেহ নামানোর জায়গার অপেক্ষায় ছিল।

আর বাইরে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলোর অপেক্ষা কখন জানা যাবে, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের প্রিয়জন আছেন কি না।

নেপালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। একদিকে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, অন্যদিকে স্বজনদের সামনে দাঁড়িয়েছে প্রিয়জনের মরদেহ শনাক্ত করার কঠিন বাস্তবতা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com