রবিবার, ০১:৫০ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, [bangla_date] , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

ভূ-রাজনীতি ও নির্বাচনে ‘অপতথ্য’ অস্ত্র

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

নির্বাচন ঘনিয়ে এলে কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে রাজপথের পাশাপাশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ডিজিটাল দুনিয়া। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতি এখন আর কেবল জোরাল বক্তব্য বা মতাদর্শের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত পলিটিক্যাল ডিসইনফরমেশন বা রাজনৈতিক অপতথ্যের যুদ্ধে। ক্ষমতার মসনদে বসা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা কিংবা কোনো দেশের জাতীয় নির্বাচন ও সরকারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে অপতথ্যকে এখন একটি কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক সাইবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ গুজবের চেয়ে রাজনৈতিক অপতথ্য অনেক বেশি পরিকল্পিত, সুসংগঠিত এবং বিপুল অর্থায়নপুষ্ট।

রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য, পাঠকদের মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমবন্দি করে একটি সুনির্দিষ্ট নারেটিভ বা গল্পের প্রতি বিশ্বাসী করে তোলা। নির্বাচনের আগে কোনো রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভুয়া অডিও, কাল্পনিক আর্থিক কেলেঙ্কারি কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্তের বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকে স্বয়ংক্রিয় বট অ্যালগরিদম এবং স্পনসরড পেজ নেটওয়ার্ক। এগুলো দিয়ে একটি ভুয়া খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনভাবে বারবার পোস্ট ও শেয়ার করা হয়, যেন সাধারণ নাগরিকের মনে হয়, এটিই দেশের মূলধারার জনমত। ফলে নিরপেক্ষ বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ভোটাররা চরম বিভ্রান্তির শিকার হন এবং ভুয়া বয়ানের ওপর ভিত্তি করেই মতবদি করেন।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও নির্বাচনে অপতথ্য প্রয়োগের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি স্পষ্ট উদাহরণ সামনে আসে: ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য ব্যবহারে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির তথ্য প্রমাণিত হয়। জাস্ট সিকিউরিটির প্রতিবেদনে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা সম্পর্কিত গবেষণা এবং ইউনিভারসিটি অব বার্মিংহামের বিশ্লেষণ নিবন্ধ অনুযায়ী, কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডাটা বিশ্লেষণ করে বিশেষ কিছু ভোটারের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট অপতথ্য ও প্রোপাগান্ডা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, যা নির্বাচনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে মার্কিন ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনের সময় নিউ হ্যাম্পশায়ারের ভোটারদের কাছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো একটি ভুয়া অডিও কল পাঠানো হয়। সেখানে ভুয়া কণ্ঠস্বরে ভোটারদের ভোট না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় এআই অপপ্রয়োগের এক মারাত্মক নিদর্শন।

এমনকি ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংঘাতের দুই পক্ষকে (ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন) নিয়ে বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও এবং পুরোনো যুদ্ধের ফুটেজ সম্প্রতি ঘটেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। পিবিএস নিউজআওয়ারের আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ মতে, সামাজিক মাধ্যমে এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা চালানো হয়।

অপতথ্য এখন আর কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে উসকে দেওয়া, জাতীয় নির্বাচনকে বিতর্কিত করা কিংবা সরকারবিরোধী সহিংসতা তৈরি করতে বিদেশি ট্রোল ড্রাইভ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। এর মাধ্যমে অন্য কোনো দেশের শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়াই থাকে মূল ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো ভোটারের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার। কিন্তু রাজনৈতিক অপতথ্য ভোটারের সেই সত্য জানার সুযোগ কেড়ে নেয়। জনগণের ভোটাধিকার যখন কৃত্রিম বিতর্ক ও আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে, তখন পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যেতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ভূ-রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক অপতথ্যের থাবা থেকে বাঁচতে হলে টেক প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরপেক্ষ আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com