বুধবার, ০৮:৩০ অপরাহ্ন, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।
শিরোনাম :
ভারী বৃষ্টিতে আবারও তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে দ্য ন্যাশনাল নিউজের প্রতিবেদন ,হরমুজ সংকটে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সমীকরণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ফ্রান্সের অভিনন্দন মোদির ভিডিও অপসারণ: ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইল মেটা পদত্যাগের গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী বৃহস্পতিবার ‘জুলাই গণহত্যায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করলে কেউ রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের সাহস পাবে না’ আরেকটি বিপ্লব আসন্ন, দেশবাসীকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার আরেকটি বিপ্লব আসন্ন, দেশবাসীকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান বিরোধীদলীয় নেতার ‘এককালের আপোষহীন বিএনপি এখন আপোসকামী হয়ে জনরায় উপেক্ষা করছে’

দ্য ন্যাশনাল নিউজের প্রতিবেদন ,হরমুজ সংকটে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সমীকরণ

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ০ বার পঠিত

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে টানা পাঁচ মাস ধরে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এতদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল-বিশ্ববাজারে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না। কিন্তু এখন বিশ্লেষকদের মতে, আরও বড় একটি ঝুঁকি সামনে এসেছে। সেটি হলো, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদাও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।

এখনও অনিশ্চয়তায় হরমুজ প্রণালি
সংকটের পাঁচ মাস পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে-হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজিবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না।

প্রশ্নটি মোটেও তাত্ত্বিক নয়। গত মার্চে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর (অনিবার্য পরিস্থিতি)’ ঘোষণা করার পর এক ধাক্কায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংঘাত কিছুটা কমলেও এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত মূল্যহার (ওয়ার প্রিমিয়াম) থেকে কিছুটা নেমে এলেও এলএনজির বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতিতে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি।

২৯ জুলাই কাতারএনার্জি পরিচালিত ‘আল আরিশ’ নামের একটি এলএনজিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বের হয়। ১১ জুলাইয়ের পর এটিই ছিল প্রণালি ত্যাগ করা প্রথম নিবন্ধিত এলএনজি জাহাজ। একই সঙ্গে কাতারএনার্জি তাদের ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিসের মেয়াদ অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ফলে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

শুধু সরবরাহ নয়, বদলে যাচ্ছে পুরো বাজারের চিত্র
এ পর্যন্ত বাজারের নজর ছিল মূলত জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং মূল্যবৃদ্ধির দিকে। কিন্তু জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীর।

এই সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, এলএনজি শিল্প এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে সরবরাহ ঝুঁকি এবং চাহিদা ঝুঁকি একই সময়ে বাড়ছে। আধুনিক এলএনজি শিল্পের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে শিল্পটি দুটি মৌলিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল-
•    একবার এলএনজি উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি হলে সেই গ্যাস সহজেই বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছানো যাবে।
•    বৈশ্বিক চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে এবং নতুন উৎপাদন সহজেই বাজারে জায়গা করে নেবে।
বর্তমান সংকট এই দুই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সরবরাহ আংশিকভাবে সামাল দিলেও ঝুঁকি বিদ্যমান
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন উৎপাদন এবং পুরোনো উৎপাদকদের বাড়তি সরবরাহ মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হারিয়ে যাওয়া এলএনজির প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
এটি বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সক্ষমতা ও নমনীয়তার একটি বড় প্রমাণ।

তবে একই সঙ্গে বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়েছে-বাকি ২৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণের মতো বিকল্প উৎস ছিল না। অর্থাৎ বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সেটি ঝুঁকিমুক্ত হয় না। কারণ প্রতিবার উত্তেজনা তৈরি হলে জাহাজ ভাড়া বাড়ে, বিমার খরচ বৃদ্ধি পায় এবং বাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে।

এর প্রভাব মূল্যেও স্পষ্ট। জানুয়ারিতে যেখানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার, সেখানে জুলাই মাসের বড় অংশে তা ২০ থেকে ২২ ডলারে পৌঁছেছে।

বর্তমানে যুদ্ধসংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রকাশ পেলেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম একদিনেই কয়েক শতাংশ ওঠানামা করছে।

ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক চাহিদা
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে চাহিদার ক্ষেত্রে।
প্রতিটি ভূরাজনৈতিক সংকটই দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানির দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে বাধ্য করছে। ফলে বিভিন্ন সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

কিছু দেশ আবার জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও নিচ্ছে।

শিল্পকারখানাগুলো জ্বালানি ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা কখনও হঠাৎ করে কমে যায় না। এটি নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের অসংখ্য ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তবে কখনও কখনও বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকট এই পরিবর্তনকে অনেক দ্রুত ত্বরান্বিত করে।

চাহিদা কমার আশঙ্কা
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাস স্ট্র্যাটেজিসের এর একটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি বছরের বাকি সময়জুড়ে আরব উপসাগর থেকে এলএনজি রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত থাকে, তাহলে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক এলএনজির চাহিদা প্রায় ৮ শতাংশ কমতে পারে।

কাতারএনার্জির অক্টোবর পর্যন্ত ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ বহাল রাখার সিদ্ধান্তও এমন আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করছে।

অন্যদিকে শেল-এর সর্বশেষ বাজার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল চলতি মৌসুমেই পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি নাও থাকতে পারে, এমনকি বার্ষিক সংকোচনও দেখা দিতে পারে।

কোম্পানিটি জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরও এলএনজি রফতানি টার্মিনালগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে।

এমনটি হলে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে প্রবৃদ্ধি থেমে যেতে পারে।

সামনে আসছে নতুন উৎপাদনের ঢেউ
এদিকে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ কিন্তু থেমে নেই। বর্তমানে যেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে এবং নির্মাণকাজ চলছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বছরে আরও প্রায় ২০ কোটি ৭০ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে।

তুলনামূলকভাবে, গত বছর বিশ্বে মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ কোটি ২০ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের মধ্যে বর্তমান বাজারের প্রায় অর্ধেক সমপরিমাণ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হতে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- ভবিষ্যতে সমস্যা কি পর্যাপ্ত এলএনজি উৎপাদনের হবে, নাকি সেই এলএনজি কেনার মতো পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে?

বদলে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার ধরন
অনেক বিশ্লেষক এতদিন ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে দূরবর্তী ঝুঁকি হিসেবে দেখতেন। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাস্তব রূপ নিচ্ছে।

কারণ, যে অনিশ্চয়তা আজ সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, সেই একই অনিশ্চয়তা দেশগুলোকে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথেও এগিয়ে দিচ্ছে।

ফলে উৎপাদকদের এখন ভাবতে হচ্ছে, ভবিষ্যতের চাহিদা আদৌ নতুন বিনিয়োগকে যৌক্তিক করবে কি না। অন্যদিকে ক্রেতাদেরও নিশ্চিত হতে হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহের ওপর কতটা ভরসা করা যাবে।

আস্থাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে এলএনজি কোম্পানির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল গ্যাসক্ষেত্রের মালিকানা, উৎপাদন অবকাঠামো এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা।

কিন্তু আগামী দশকে সফল হবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা শুধু গ্যাস নয়, বরং নমনীয় সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস, সংরক্ষণ সুবিধা, বহুমুখী সরবরাহ উৎস এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দিতে পারবে।

এমন এক বাজারে, যেখানে গ্যাসের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকতে পারে কিন্তু আস্থার ঘাটতি থাকবে, সেখানে ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কই সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে পরিণত হবে।

হরমুজ প্রণালির সংকট শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক এলএনজি শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামোই বদলে দিচ্ছে।

আগামী দিনের প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হবে কে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারবে, তা দিয়ে নয়; বরং কে অনিশ্চয়তার মধ্যে ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি আস্থা দিতে পারবে, তা দিয়ে। অর্থাৎ এলএনজি বাজারের ভবিষ্যৎ আর শুধু গ্যাস, অবকাঠামো কিংবা দামের ওপর নির্ভর করবে না। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com