মঙ্গলবার, ১২:১৩ অপরাহ্ন, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

নানা জটিলতায় আটকা নির্মাণাধীন ৩০৪০ ফ্ল্যাট

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

দেশের ৬৬টি পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিরাপদ ও মানবিক আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করছে ‘পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ’ প্রকল্প। কিন্তু নানা জটিলতায় আটকে আছে প্রকল্পের নির্মাণাধীন ৩ হাজার ৪০টি ফ্ল্যাট। পাঁচ বছর পার হলেও এসব ফ্লাটে ওঠা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছে এখনও স্বপ্ন হয়েই আছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ ও ভৌত অগ্রগতি ২৫ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দুটি স্থানে মামলা চলমান থাকা, ১৮টিতে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক বিলম্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ের বাধা-বিপত্তির কথা জানা গেছে। ফলে অধিকাংশ পৌরসভায় প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সন্তোষজনক নয়। এমন চিত্র উঠে এসেছে সরকারের প্রকল্প নজরদারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদনে।

আইএমইডি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসন গড়ে তোলা এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। প্রকল্পটি জাতীয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশোধিত এডিপিতেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং একাধিক অর্থবছরে বরাদ্দ পেয়েছে।

প্রকল্পটির ওপর নিবিড় পরিবীক্ষণ পরিচালনা করে আইএমইডি বলেছে, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কাজের গতি ধীর হওয়ায় একাধিক ক্ষেত্রে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আইএমইডির মূল্যায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক, কারিগরি, আর্থিক এবং সমন্বয়হীনতা নানা সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক পৌরসভায় নির্মাণস্থলের জমি হস্তান্তর ও মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। কোথাও জমির সীমানা নির্ধারণ, কোথাও স্থানীয় বিরোধ কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়েছে। এতে প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়নের সূচি পিছিয়ে পড়ে।

আইএমইডির আরও পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- নকশা অনুমোদন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং ঠিকাদার নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে অনেক বেশি সময় লেগেছে। ফলে বাস্তব নির্মাণকাজ শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ঠিকাদারের সক্ষমতার ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল ও নির্মাণসামগ্রীর অভাব এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতাও প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ব্যয় ও সময়Ñ উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এলজিইডি, সংশ্লিষ্ট পৌরসভা, স্থানীয় প্রশাসন এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্য আদান-প্রদানে বিলম্বের কারণে অনেক কাজ আটকে থাকে। কোথাও প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগ, আবার কোথাও স্থানীয় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আইএমইডি আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে। সময়মতো অর্থছাড়, বিল পরিশোধ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বিলম্বের কারণে ঠিকাদাররা নির্ধারিত গতিতে কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রভাবও প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

প্রতিবেদনে প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিবীক্ষণ, কাজের গুণগত মান যাচাই এবং অগ্রগতি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি। ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিলেও দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। আইএমইডি মনে করে, নিয়মিত মনিটরিং এবং জবাবদিহি জোরদার করা গেলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

প্রকল্পের সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় আইএমইডি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর পরিবেশে বসবাস করছেন। তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ফলে বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে প্রত্যাশিত সামাজিক সুফলও পিছিয়ে যায়।

আইএমইডি প্রকল্পের গতি বাড়াতে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ জমিসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি, বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, ঠিকাদারদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থছাড় নিশ্চিত করা, প্রকল্প পরিচালনা ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা আয়োজন এবং মাঠপর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের তদারকি বাড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দেশের ৮ বিভাগের ৫৯ জেলার ৬৬ পৌরসভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। নির্বাচিত ৬৬ পৌরসভায় ৩ হাজার ৪০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ হচ্ছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ১৪১ কোটি ৫২ লাখ ১১ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নকাল সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২৭। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব বাজেটের আওতায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে চলমান এ প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রকল্পের আওতায় এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অনুযায়ী ১ হাজার ৮৬০টি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ১২ শতাংশ ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে প্রতীয়মান। এ ছাড়া ৮৫০ পরিবারকে অস্থায়ী আবাসনের মাধ্যমে পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত সীমানা প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি।

দেখা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫.৬১ একর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ৫.৬৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ৬৬টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, সুয়ারেজ পরিশোধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা স্থাপন এবং ১১ হাজার বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সার্বিকভাবে প্রকল্পটির শুরু থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ১৭ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে প্রকল্প এলাকার ২টি স্থানে মামলা চলমান, ১৮টি ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। অধিকাংশ পৌরসভায় প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সন্তোষজনক নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com