গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও শেষকৃত্য চলাকালে মানবিক কারণে সাময়িকভাবে সামরিক তৎপরতা স্থগিত রেখেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই পেন্টাগনের হাতে পৌঁছায় ইসরায়েলের নতুন একটি গোয়েন্দা সতর্কবার্তা। সেখানে দাবি করা হয়, তেহরান আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তথ্য কেবল ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনাই বাড়ায়নি; বরং ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তার ধারণা, ইসরায়েল এই গোয়েন্দা তথ্য সামনে এনে ট্রাম্পকে আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের কথিত হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সতর্কবার্তাটি চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ ধরনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাচ্ছিল। তবে ইসরায়েলের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যটি ছিল নতুন এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কৌশলও হতে পারে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করবে নাকি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বহাল রাখবে এ বিষয়ে ট্রাম্প যখন সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছিলেন, তখনই এই গোয়েন্দা তথ্য সামনে আসে।
ইসরায়েলের দেওয়া সতর্কবার্তার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সতর্কবার্তার আগে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্বভাবে এ তথ্য যাচাই করেনি এবং এমন কোনো নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের তথ্যও তাদের নজরে ছিল না।
ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের হুমকি
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান প্রকাশ্যে বলে আসছে, দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয় এবং এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সোলাইমানি নিহত হন।
এদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারির যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতাআলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানেও ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকের হাতে ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’ লেখা ব্যানারও দেখা যায়।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেও তার জীবনের প্রতি ইরানের হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করেন। আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাকে অর্থাৎ আমাকে হত্যা করতে চায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাদের প্রতিটি তালিকায় আছি। আজ সকালে দেখলাম, তাদের সব তালিকাতেই আমার নাম রয়েছে। এখন পর্যন্ত মনে হয় আমি কিছুটা ভাগ্যবান ছিলাম। তবে এই সৌভাগ্য হয়তো বেশিদিন স্থায়ী নাও হতে পারে।’
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্কে বরফ গলছে
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন কিছুটা কমেছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা নিয়ে দুই নেতার ভিন্ন অবস্থানের কারণে তাদের সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়েছিল।
নেতানিয়াহু যুদ্ধের আরও লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তিনি যুদ্ধের অবসানের পথ খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায়।
এদিকে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আবারও টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কার্যক্রম সম্পর্কেও নেতানিয়াহুকে অবহিত করেছেন।