বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; বাংলাদেশে এটি কোটি মানুষের আবেগের অংশ। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আয়োজন ঘিরে দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত এলাকাতেও তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। সেই বিশ্বকাপের ম্যাচ টেলিভিশনের পর্দায় দেখানোর অধিকার নিয়ে ২০২২ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, চার বছর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আবারও তা আলোচনায় উঠে এসেছে।
কারণ, এবার বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ফিফার কাছ থেকে সরাসরি সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছে। সরকারের দাবি, এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় ধরনের সাশ্রয় হয়েছে। অন্যদিকে ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিটিভি যে প্রক্রিয়ায় সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছিল, তা নিয়ে তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, এখনও উঠছে। নতুন করে আলোচনায় এসেছে কেন একটি নির্মাণকাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিল এবং কেন রাষ্ট্রকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছিল।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৬ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিটিভির জন্য বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় যাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের কাছ থেকে বিটিভি সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, তমা কনস্ট্রাকশন দেশের অন্যতম বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও ক্রীড়া সম্প্রচারস্বত্ব ব্যবসার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরের সম্প্রচারস্বত্ব কিনে তা আবার বিটিভির কাছে বিক্রি করার মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি।
তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব ফিফা থেকে প্রথমে কিনে নেয় ভারতের ভায়াকম ১৮। পরে সেটি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে নরওয়েস্টার ওমর কে স্পোর্ট জয়েন্টভেঞ্চারের কাছে যায়। সেখান থেকে স্বত্ব কিনে নেয় তমা কনস্ট্রাকশন। এরপর বিটিভি সেই তমার কাছ থেকেই সম্প্রচারস্বত্ব সংগ্রহ করে।
এই দীর্ঘ মধ্যস্থতাকারী শৃঙ্খল নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল। সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, যত বেশি হাত ঘুরবে, তত বেশি মূল্য বাড়বে। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন জানা যায়, বিটিভিকে এ জন্য ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে শুরুতে প্রায় ৫৪ কোটি টাকার একটি কাঠামো বিবেচনার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই সীমা অতিক্রম করে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ বিভাগ তখন পরামর্শ দিয়েছিল যে স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, পর্যাপ্ত সময় না থাকায় সেই পথ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
বিটিভির তৎকালীন কর্মকর্তারাও বলেছিলেন, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার খুব অল্প সময় আগে সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সীমিত ছিল। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, বিশ্বকাপের মতো একটি আসরের সময়সূচি বহু আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। সুতরাং শেষ মুহূর্তের সময়সংকটকে যথেষ্ট যুক্তি হিসেবে দেখানো কঠিন।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল তমা কনস্ট্রাকশনের ভূমিকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আতাউর রহমান ভুইয়া ওরফে মানিক সে সময় বলেছিলেন, বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে তাদেরও বড় অঙ্কের ব্যয় হয়েছে এবং ৯৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত নয়। তিনি আরও বলেছিলেন, তারা ব্যবসায়ী; যেখানে ব্যবসার সুযোগ আছে, সেখানেই যাবেন।
কিন্তু সমালোচকেরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। তাদের প্রশ্ন ছিল, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের বাজারে প্রবেশ করল কীভাবে? আর সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ থাকায় বিতর্ক আরও গভীর হয়।
আতাউর রহমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন এবং জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশাসনকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২২ সালের পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর অনেকগুলোর সন্তোষজনক উত্তর কখনোই জনসমক্ষে আসেনি। বিশেষ করে কেন ফিফা বা স্বত্বধারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়নি, কেন একাধিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্বত্ব কিনতে হলো এবং কেন ব্যয় এতটা বেড়ে গেল—এসব প্রশ্ন রয়ে গেছে।
চার বছর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ অনুসরণ করেছে বলে দাবি করছে। এবার বিটিভি সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭ কোটি টাকার সমান। ভ্যাট ও করসহ মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের দাবি অনুযায়ী এই অর্থের বড় অংশই বিজ্ঞাপন, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাছে স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এখানেই ২০২২ ও ২০২৬ সালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে ৬৪ ম্যাচের বিশ্বকাপ সম্প্রচারে ব্যয় হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। অথচ এবার ১০৪ ম্যাচের বিস্তৃত বিশ্বকাপের জন্য চুক্তিমূল্য তুলনামূলকভাবে কম। যদিও দুটি আসরের বাজার বাস্তবতা এক নয় এবং সরাসরি সংখ্যাগত তুলনা সব সময় নিখুঁত চিত্র দেয় না, তারপরও ব্যয়ের এই পার্থক্য জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতে অস্বচ্ছতা ও মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে ব্যয় বেড়েছিল। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় জনগণের অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের কঠোর অবস্থান এবং সরাসরি আলোচনার ফলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্রের দাবি, সম্প্রচারস্বত্ব ক্রয়ের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতার পরিবর্তে সরাসরি আলোচনার নীতি গ্রহণে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিষয়টি কেবল অর্থ সাশ্রয়ের নয়; বরং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠারও একটি উদাহরণ।
অবশ্য সরকারের প্রশংসার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রয়েছে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বত্ব কেনার ক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তবে সামগ্রিকভাবে দেখলে ২০২৬ সালের উদ্যোগটি ২০২২ সালের বিতর্কের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে যে প্রশ্ন ও সমালোচনা ছিল, বর্তমান সরকার সেই জায়গাতেই নিজেদের সাফল্যের দাবি করছে। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে সরাসরি উৎস থেকে স্বত্ব কেনার সিদ্ধান্তকে তারা সুশাসনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক সরকারের সমালোচনা এবং অন্য সরকারের কৃতিত্বের দাবি নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্বের ঘটনাটি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও। জনগণের করের টাকা কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।
২০২২ সালের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হয়তো এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের অভিজ্ঞতা অন্তত দেখিয়েছে যে বিকল্প পথ ছিল। সরাসরি আলোচনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে একই ধরনের একটি আয়োজন তুলনামূলক কম ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় কোটি মানুষ যখন মাঠের লড়াই দেখার অপেক্ষায়, তখন পর্দার আড়ালের এই অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ফুটবল দেখার নয়; প্রশ্নটি জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার। আর সেই জায়গায় ২০২২ সালের বিতর্কিত অধ্যায় এবং ২০২৬ সালের নতুন উদ্যোগ দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক পাঠ হয়ে থাকবে।