বৃহস্পতিবার, ০২:৫৭ অপরাহ্ন, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

অতিবৃষ্টি পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন জেলায় বন্যা

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত

অবিরাম বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হাওরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক। পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সারাদেশের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা।

চট্টগ্রাম নগরীতে সামান্য বৃষ্টিতেই ফের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার দুপুরে বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক পানিতে ডুবে যায়। হাসপাতালের মর্গেও পানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খাল দখল ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যার চিত্র ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মধ্যনগর উপজেলার জিনারিয়া হাওরের বাঁধ গতকাল ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় নিম্নাঞ্চলের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শত শত হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। শ্রমিক ও নৌকার সংকটে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। অনেক এলাকায় দেড় মণ ধান দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। টানা বৃষ্টিতে জেলার সুরমা, কুশিয়ারা, বৌলাই, রক্তি, যাদুকাটা, সুমেশ্বরীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দিরাই উপজেলার কালীয়াকোটা হাওরপাড়ের রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের কৃষক পুতুল সরকার বলেন, বৃষ্টির পানিতে কৃষকের সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।

চোখের সামনে পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু নৌকা ছাড়া ধান কাটা ও হাওর থেকে আনা সম্ভব হচ্ছে না। হঠাৎ করে বাজারে এত নৌকাও পাওয়া যাচ্ছে না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সুনামগঞ্জে চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও কাটা বাকি। টানা বৃষ্টিতে অনেক স্থানে হারভেস্টার ব্যবহারও সম্ভব হচ্ছে না।

দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে প্রায় ১৫০০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ হাওরের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের গ্রামগুলো হলোÑ উপজেলার ধল আশ্রম, ধল চাঁন্দপুর, কালীদ্রুম, আমিরপুর, সরালীতুপা, কাদিরপুর, ভাঙাডহর, নোয়াগাঁও, সন্তোষপুর, নাচনী, চন্দ্রপুর, ধনপুর, শাল্লার কাশিপুর। এ ছাড়া, কালিয়াগুটা, হুরামন্দিরা, টাংনী হাওরেও কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার বলেন, এ অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে অনেক কৃষকের পাকা ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

নেত্রকোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কংস নদীর পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। জেলার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কৃষক চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে নেত্রকোনায় অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সোমেশ্বরী, কংস, ধলাই, মনু, উব্দাখালীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার পাহাড়ি ঢল নেমে নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কলমাকান্দা, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্লাবিত হয়ে বন্যার শঙ্কা রয়েছে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে শত শত হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় অন্তত ৩ হাজার ৬৪ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। একইভাবে আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

নিকলী, কিশোরগঞ্জ ও অন্যান্য হাওরাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা গেছে। অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না, ফলে শ্রমিক-নির্ভর হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে কুমিল্লা, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন নগর ও শহরাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কুমিল্লায় কালবৈশাখীতে ২৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়েছেন এবং ৩৫টি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে। বরিশালে ৬৩.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ময়মনসিংহে ৯ ঘণ্টায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়া, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। উজানেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে, যা আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো ধান কাটতে না পারলে কৃষকদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হবে এবং দেশের খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত পানি নিষ্কাশন, বাঁধ মেরামত এবং কৃষকদের সহায়তায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com