১৯৬২ সালের পর প্রথম দেশ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা। আর এই স্বপ্নের কেন্দ্রে যথারীতি আছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে আটটি গোল এবং তিনটি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে তুমুল লড়াই করছেন তিনি। তবে ২০০৩ সালে বার্সেলোনায় অভিষেক হওয়া সেই কিশোর মেসির সঙ্গে আজকের মেসির আকাশ-পাতাল তফাৎ। বয়স বাড়লে গতি কমে যায়, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যেমন গতি কমে যাওয়ার পর নিজেকে পেনাল্টি-বক্সের ভয়ংকর স্ট্রাইকার হিসেবে নতুন রূপ দিয়েছিলেন, মেসি নিজেকে স্রেফ পতনের সাথে মানিয়ে নেননি। তিনি ফুটবলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বারবার নিজেকে ভেঙে গড়েছেন, বদলে ফেলেছেন নিজের খেলার ধরন।
এই বিশ্বকাপে মেসি আগের চেয়ে অনেক কম দৌড়াচ্ছেন কিন্তু সুযোগ তৈরি করছেন সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত তিনি ৩৩টি শট নিয়েছেন এবং ২১টি সুযোগ তৈরি করেছেন, যা ১৯৮৬ সালের দিয়াগো ম্যারাডোনার পর যেকোনো বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ যৌথ অবদান। মজার ব্যাপার হলো, মাঠে কাটানো সময়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ দূরত্বই তিনি হেঁটে পার করেছেন, যা টুর্নামেন্টের যেকোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুরো ৯০ মিনিটে মেসি গড়ে মাত্র ৮.২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন এবং প্রতি ম্যাচে স্প্রিন্ট করছেন গড়ে মাত্র ২.৭টি, অথচ চার বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ৫.৩। তারপরও প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নামার আগে পরিসংখ্যান বলছে, শেষ ১৫টি বিশ্বকাপ ম্যাচে পোল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দলই মেসিকে গোল করা বা করানো থেকে আটকাতে পারেনি।
মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে অন্তত পাঁচবার তার খেলার ধরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ক্যারিয়ারের শুরুতে জোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে বার্সার হয়ে ডান প্রান্তে রাইট-উইঙ্গার হিসেবে খেলা শুরু করেছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ২মে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ৬-২ ব্যবধানের সেই ঐতিহাসিক এল ক্লাসিকোতে পেপ গার্দিওলা মেসিকে উইং থেকে সরিয়ে একদম মাঝখানে নিয়ে আসেন। জন্ম হয় ‘ফলস নাইন’ নামক এক নতুন ফুটবলীয় কৌশলের। রিয়াল মাদ্রিদের রক্ষণভাগ বুঝেই উঠতে পারছিল না মেসিকে কীভাবে আটকাবে। এর পরের কয়েক বছর গোল করার এক অবিশ্বাস্য দানব হয়ে ওঠেন তিনি, ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বার্সেলোনার হয়ে ৬৯ লা লিগা ম্যাচে করেন ৯৬ গোল।
জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বিদায়ের পর বার্সেলোনার পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মেসির কাঁধে। যখন মাঠের মাঝখানে তাকে বল বানিয়ে দেওয়ার মতো বিশ্বসেরা মিডফিল্ডাররা ছিলেন না, মেসি তখন নিজেই ‘ইনিয়েস্তা’ হয়ে উঠলেন। তিনি নিচে নেমে এসে খেলা তৈরি করতে শুরু করলেন, যাকে ফুটবলীয় ভাষায় বলা হয় ‘এঙ্গানচে’ বা হুক। গোল করার চেয়ে গোল করানোর দিকে মনোযোগ দিলেন বেশি। পিএসজিতে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো তার ক্যারিয়ারে গোলের চেয়ে অ্যাসিস্টের সংখ্যা বেশি দাঁড়ায়। একজন খাঁটি গোলদাতা থেকে তিনি রূপান্তরিত হন মাঠের মূল পরিচালকে।
মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের গল্পটা ছিল আরও বেশি নাটকীয়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং পর পর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর তীব্র মানসিক চাপে তিনি অবসরের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নেতায় পরিণত হলেন। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকা জয় তাকে সব চাপ থেকে মুক্তি দেয়। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপে আমরা দেখেছি এমন এক মেসিকে, যিনি একই সাথে ২০০৯ সালের উইঙ্গার হিসেবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে অ্যাসিস্ট করছেন, আবার মাঝমাঠ থেকে কোয়ার্টারব্যাকের মতো নিখুঁত পাসে পুরো খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন।
বর্তমানে ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি মাঠে দৌড়ানোর চেয়ে হাঁটেন বেশি। এক সময় সমালোচকরা এটাকে অলসতা বললেও আজ ফুটবল বিশ্ব এটাকে দেখে তার অনন্য ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা হিসেবে। তিনি শক্তি সঞ্চয় করেন কেবল সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোর জন্য, যেখানে এক সেকেন্ডের জাদুতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। মেসির শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন, ‘শেষের মেসিই সবসময় সেরা মেসি।’ কথাটা আজ ভীষণ সত্যি। মেসির দুই দশকের ক্যারিয়ার কেবল ট্রফি আর রেকডর্সের গল্প নয়, বরং নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করে ফুটবলের রাজপুত্র হিসেবে টিকে থাকার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।