প্রধানমন্ত্রী কয়েক দশক ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তার বক্তব্য এবং চিন্তাগুলো নির্বাচনের আগে ইশতেহারে ফুটে উঠেছে। সেই আলোকে আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমরা যে চারটি নতুন বই নিয়ে কথা বলছি, এগুলো প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘকালের শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে রুপকল্প, চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কর্মযজ্ঞেরই প্রতিফলন।
আজ রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক মাধ্যমিক স্তরের চারটি নতুন পাঠ্যপুস্তকের কাঠামো চূড়ান্তকরণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস একদিকে আমরা যেমন বলছি বাংলায় আনন্দময় শিক্ষা বা আনন্দময় শিখন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য টিচার্স গাইড (টিজি) নিয়োগের বিষয়টি ইতোমধ্যেই আলোচনা হয়েছে। সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বইয়ের ক্ষেত্রে, অন্ততপক্ষে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি- এই দুইটি বইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটিকে প্রচলিত বা ট্র্যাডিশনাল পাঠ্যবইয়ের তুলনায় আরও বেশি ব্যতিক্রমধর্মী ও ভিন্নধর্মী করা উচিত।’
তিনি বলেন, যেমন আমরা সবসময় দেখি বইগুলো সাধারণত টেক্সট-ভিত্তিক হয়, অর্থাৎ অনেক বেশি লেখা থাকে। ফলে অনেক সময় বিষয়টি শিক্ষার্থীদের কাছে ততটা আকর্ষণীয় মনে হয় না। অন্তত লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আমরা ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যে আলোচনা করেছি, তাতে আমরা চাই বইটিতে আরও বেশি দৃশ্যমান উপস্থাপনা থাকুক। আরও বেশি ছবি, টেবিল, ডায়াগ্রাম ও ভিজ্যুয়াল উপাদান থাকুক, যাতে শিক্ষার্থীদের বইটি পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং তারা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে।
লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের ক্ষেত্রে আরও কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘শুরুতে একটি বিস্তারিত ভূমিকা অধ্যায় থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি এই বইয়ের মাধ্যমে আমরা কী অর্জন করতে চাই, শিক্ষা ব্যবস্থায় এর দার্শনিক ভিত্তি ও বাস্তব প্রয়োগ কী হবে এবং এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু এসব বিষয় নিয়ে যদি আরও কিছু যুক্ত করা যায় তাহলে বইটি আরও সমৃদ্ধ হবে।’
কারিগরি শিক্ষা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, এ ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। কারিগরি শিক্ষা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো এ বিষয়ে একটা ট্যাবু বা স্টিগমা কাজ করে যে, কারিগরি শিক্ষা সবার জন্য নয়। এক্ষেত্রেও যদি একটি অতিরিক্ত ব্যাকগ্রাউন্ড অধ্যায় রাখা যায়, যেখানে কারিগরি শিক্ষার দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ কী এবং কেন কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন মানুষ তার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে পারে, তা যদি তুলে ধরা হয় তাহলে ভালো হবে। কারণ, কারিগরি শিক্ষার মূল বিষয়ই হচ্ছে এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে মোটিভেশন তৈরি করা।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমানে যেটা হয় অনেকে কারিগরি শিক্ষায় আসতে চায় না। আমাদের মূল দর্শন হলো, বাংলাদেশের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুল থেকে শুরু করে ঢাকার সেরা স্কুল পর্যন্ত, প্রত্যেকটি স্কুলেই কারিগরি শিক্ষার একটি ল্যাব বাধ্যতামূলক করা হবে। এমনকি বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম সারির শিক্ষার্থীও যেন অন্তত কিছুটা হলেও কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে। সুতরাং, মোটিভেশনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আনতে হবে, কেন বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীরই অন্তত কিছুটা হলেও কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘সব মিলিয়ে যে কাজটুকু হয়েছে, তা খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে হয়েছে। কারণ, আমরা শুধু এই চারটি বই নিয়েই কাজ করছি, বিষয়টি এমন নয়। এর পাশাপাশি আমরা জানি, ফ্যাসিবাদের সময়ে বিভিন্ন বইয়ে অসংখ্য ভুল ছিল। এ বিষয়ে আমাদের যেসব বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বসেছি। অনেকেই বিভিন্ন ধরনের ভুল চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইতিহাসেরও অনেক বিকৃতি ছিল। আমরা বলেছি, ইতিহাসের নির্মোহ বহিঃপ্রকাশ যেন থাকে। আমাদের ইতিহাসকে আমাদের মতো করে সাজানোর প্রয়োজন নেই।’
তিনি বলেন, এই নির্বাচিত সরকারই জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার। ইতিহাসের প্রতিটি পালাবদলে বিএনপি সঠিক অবস্থানে মানুষের পাশে ছিল। আমরা চাই, ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে সত্য, সেটিই উঠে আসুক। সেই কাজও সমান্তরালভাবে চলমান রয়েছে। সুতরাং, একটি কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়ায় প্রতিবছরই যে অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের প্রয়োজন হয়, সেসব কাজ ইতোমধ্যেই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিমার্জনও অব্যাহত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও বলেন, নতুন চারটি সাবজেক্ট যুক্ত করা এবং সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি টিম গঠন করে সেই কাজগুলো মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা, এটি সত্যিই একটি বড় মহাযজ্ঞ। এজন্য এনসিটিবি এবং আমাদের যেসব সাবজেক্ট এক্সপার্ট গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, পাশাপাশি যারা এর আগে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনারা সবাই অত্যন্ত ভালো কাজ করেছেন।
বিশেষ করে এই চারটি বইয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনেক আবেগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি তার দীর্ঘদিনের কর্মপরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামনে যেহেতু প্রায় এক মাসের মতো সময় রয়েছে, তাই ডেভেলপমেন্ট বা রিভিশনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, সেটুকু কাজ আরও করা উচিত। পুরো বাংলাদেশ এই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। অবশ্যই খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ, সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কারিগরি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস। কারণ এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই বইটিকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, এর কারিকুলামকে কীভাবে আরও প্রাসঙ্গিক করা যায় এবংপ্রধানমন্ত্রী যেভাবে এটি দেখতে চান, সেই লক্ষ্য ও ভাবনার সঙ্গে কীভাবে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করার জন্য পুরো টিমের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
মাহ্দী আমিন বলেন, আমাদের লক্ষ্য আগামী ১ জানুয়ারি যেন দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া যায়। সে হিসেবে বই বিতরণের লজিস্টিকসের জন্য প্রায় এক মাস সময় প্রয়োজন হবে। যে ডেডলাইন রয়েছে, সে অনুযায়ী অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে আমাদের প্রায় ৩১ কোটি বই প্রস্তুত থাকতে হবে। এরপর সারা বাংলাদেশে এই বিপুলসংখ্যক বই কীভাবে প্রকাশ, মুদ্রণ ও বিতরণ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে, সেই মহাযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক প্রমুখ।