মঙ্গলবার, ০১:৩৫ অপরাহ্ন, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

৫৫ প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা করবে দুদক

সময়ের কণ্ঠধ্বনি ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত

ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎসহ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে সাইফুজ্জামানের নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও পরিচিত ছোট ব্যবসায়ীদের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পায় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। এ ঘটনায় বেশ কিছু মামলা করা হয়েছে। আরও শতাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান। শিগগিরই অর্ধশতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্ততি নিচ্ছে দুদক।

দুদক থেকে জানা যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ইউসিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইউসিবি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে এসব ঋণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়ার একটি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাইফুজ্জামানের নির্দেশে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট শাখা থেকে ফেরদৌস এন্টারপ্রাইজের নামে ৭ কোটি, ফিউশন এটসের নামে ৭৫ লাখ, মানিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে ৮ কোটি, মৃদুল এন্টারপ্রাইজের নামে ৬ কোটি, সেন অ্যান্ড সন্সের নামে ৬ কোটি ও প্রভাতী ট্রেডার্সের নামে ৮ কোটি টাকা নিয়েছেন।

চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে শাওন ট্রেডার্সের নামে ৭৫ লাখ, কদমতলী শাখা থেকে মেঘনা ট্রেডার্সের নামে ২৯ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৫৩০ টাকা, মুরাদপুর শাখা থেকে আয়ুব অ্যান্ড সন্সের নামে ৩ কোটি ৫০ লাখ ও রহমত ট্রেডার্সের নামে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন। পাহাড়তলী শাখা থেকে আবুল কালাম ট্রেডার্সের নামে ৭ কোটি, আহম্মদ অ্যান্ড সন্স ৬ কোটি, বুলু বার্ড এস্পোরিয়াম ১০ কোটি, ফেরদৌস অ্যান্ড ব্রাদার্স ৭ কোটি, হাবিবুর ট্রেডার্স ৭ কোটি, হক অ্যান্ড সন্স ৫ কোটি, জাহান ট্রেডিং ৭ কোটি, খালেক অ্যান্ড সন্স ৫ কোটি, খান অ্যান্ড ব্রাদার্স ৪ কোটি, বিশাল ট্রেডার্স ৪ কোটি ৭৫ লাখ, ইসলাম ট্রেডার্স ৫ কোটি, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ ৪৫ লাখ, নাজ ইন্টারন্যাশনাল ৮ কোটি ৫০ লাখ, রাহুল অ্যান্ড সন্স ৬ কোটি, রাসেল এন্টারপ্রাইজ ৭ কোটি, শফিকুল ট্রেডার্স ৫ কোটি, স্টেলার ট্রেডিং ৩ কোটি, জাইফা ট্রেডার্স ১ কোটি ৭৫ লাখ, জুম ইন্টারন্যাশনাল ১২ কোটি ও নুর ট্রেডার্সের নামে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া নগরীর পোর্ট শাখা থেকে ড্রিম ইন্টারন্যাশনালের নামে ৮ কোটি, জিএইচএম ট্রেডার্স ৩ কোটি, হুসাইন ট্রেড ৯ কোটি ৫০ লাখ, খাজা ট্রেডিং ৯ কোটি ৫০ লাখ, এসএল এন্টারপ্রাইজ ৪ কোটি এবং স্টেশন রোড শাখা থেকে শাহ চাঁদ আওয়ালিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন। ইউসিবি ব্যাংকের চকবাজার, স্টেশন রোড, বদ্দারহাট. পাহাড়তলী ও পোর্ট শাখা থেকে ঋণের নামে ১৯টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ১৩৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৯টি মামলা করেছে দুদক। মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী ইউসিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানসহ ব্যাংক কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি নিজের কর্মচারীদের ব্যবসায়ী সাজিয়ে এবং পরিচিত ব্যবসায়ীদের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি ঘুষ নিয়েছেন।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ইতোমধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও অন্যদের নামে ১৯টি মামলা করা হয়েছে। আরও ৫৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী প্রায় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এসব ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও আসামি করা হচ্ছে। যারা আসামি হচ্ছে তারা আতঙ্কে আছেন। ওই সব ব্যবসায়ী মূলত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতারণার শিকার হয়ে এখন দুদকের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।

দুদকের তথ্যমতে, গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই সরকারের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, আমলা ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির বিষয়ে দুদকে অভিযোগ আসতে থাকে। এ তালিকায় জোরালোভাবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম আসে। তিনি অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই ও সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে পাচার করেন। দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করছে।

এদিকে সাইফুজ্জামানের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের অংশ হিসেবে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার এবং স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুদক। এরপর গত বছরের গত ১৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশে-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের জব্দের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত। গত ১৫ জানুয়ারি আদালত নতুন করে আরও পাঁচ দেশে থাকা সম্পদ জব্দের আদেশ দেন।

তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তার ৫৮১টি ফ্ল্যাট-বাড়ি ও ৮টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পায় দুদক। এসব সম্পদের মূল্য প্রায় তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। আর বিদেশে ৮টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশের বাইরে তার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com