অন্য ভাষায় :
বৃহস্পতিবার, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :
মানব সেবায় নিয়োজিত অলাভজনক সেবা প্রদানকারী সংবাদ তথ্য প্রতিষ্ঠান।

বিদায়! হে জ্ঞানের বাতিঘর

মুহাম্মদ মেহেদী হাসান
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২২
  • ৫৩ বার পঠিত

চলে গেলেন বিশ্ব মুসলিম মিল্লাতের প্রাণপুরুষ, সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রতিভাবান লেখক, বিশ্ববিখ্যাত আলেম, প্রখ্যাত দাঈ, আইনজ্ঞ, বহু গ্রন্থ রচয়িতা, গবেষক, অসংখ্য আলেমের উস্তাদ ড. ইউসুফ আল কারযাভী; গত ২৬ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় ৯৬ বছর বয়সে দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে আল্লাহ তায়ালার জিম্মায়। মুসলিম উম্মাহর বিশ্ববিখ্যাত কিংবদন্তি ড. কারযাভী; প্রসিদ্ধ একজন শিক্ষক হিসেবে তার হাতে অসংখ্য দাঈ ইলাল্লাহ, ইসলামী স্কলার এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার অসংখ্য যোগ্য নেতাকর্মী গড়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন মজলুম মানবতার বন্ধু ও জুলুমের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর। মুসলিম উম্মাহর খেদমতে রচনা করেছেন শতাধিক গ্রন্থ, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাদৃত ও অনেক ভাষায় অনূদিত। যুগ জিজ্ঞাসার তার ফিকহি সমাধান সর্বমহলে সমাদৃত ছিল।

যুগশ্রেষ্ঠ এই ইসলামী স্কলার ১৯২৬ সালে মিসরের নীল নদের ব-দ্বীপ সাফত তুরাব গ্রামে ধর্মপ্রাণ মুসলিম কৃষকের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে মিসরের গারবিয়া গভর্নরেটের অন্তর্গত। মাত্র দুই বছর বয়সেই বাবাকে হারান খ্যাতনামা এই পণ্ডিত। বাবার মৃত্যুর পর, তিনি তার চাচার কাছে পালিত হন ও বেড়ে উঠেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেন।

পরবর্তীতে আল-আজহারের শিক্ষাপদ্ধতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন। উচ্চমাধ্যমিকে তিনি পুরো মিসরে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। প্রাচীন বিদ্যাপীঠ আল-আজহারের উসুলুদ দ্বীন অনুষদ থেকে অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডি বিষয় ছিল ‘জাকাত ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে তার প্রভাব’।

বর্তমান সময়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ড. কারযাভী ইসলামের সব শাখায় বিচরণ করেছেন, বিশেষ করে ইসলামের মৌলিক বিষয়ে তার লেখা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ইসলামের নানাবিধ বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান ও ইসলামী সাহিত্যের সব শাখায় তার বিচরণ তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, ইসলামী আন্দোলন, মানবজীবন, সামাজিক বিধান, দর্শনসহ নানা বিষয়ে তিনি শতাধিক বই লিখেছেন। সমসাময়িক বিশ্বে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দিয়েছেন। ইসলাম যে কোনো চরমপন্থা নয়; বরং ইসলাম একটি মধ্যমপন্থার নাম, তা তার লেখনীতে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, মধ্যমপন্থী স্কলারদের সুসংগঠিত করেছেন। ইজতিহাদে ভারসাম্যপূর্ণ মতামত প্রদানকারী ও ইসলামের পুনর্জাগরণে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমন্বিত পরিকল্পিত আন্দোলনকামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে শায়খ ইউসুফ আল কারযাভী সারা পৃথিবীতে অনন্য ছিলেন। গোটা আরব বিশ্বে রীতিমতো ইসলামী নবজাগরণ তৈরি করেছিলেন। মূলত লেখনীর কারণেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার লেখনীতে ইসলামী সাহিত্য হয়েছে সমৃদ্ধ।

আজকের দুনিয়ায় ড. ইউসুফ আল কারযাভীকে বলা হয় শ্রেষ্ঠ ইসলামী স্কলার, আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত না হলেও অনেকের কাছে তিনি সুপরিচিত। মুসলিম উম্মাহর প্রতি দরদি মন নিয়ে লিখতেন। কী মায়া খেলত তার বয়ানে! তার লেখনীতে! সে যেন এক অনুসন্ধিৎসার খনি। প্রতিটি লেখায় যে মুক্তা ঝরে; অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য শিক্ষকদের কাছে ছাত্রজীবনেই ‘আল্লামা’ খেতাবে ভ‚ষিত হয়েছেন। পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমানের পক্ষে তার অবস্থান ছিল খুবই দৃঢ়, উস্তাদ কারযাভীর লেখা পড়লেই তার জ্ঞানের গভীরতা সম্বন্ধে আন্দাজ করা যায়। মুসলিম উম্মাহর আত্মিক ও নৈতিক উন্নয়ন এবং মূল্যবোধ জাগ্রত করতে তিনি প্রায় ১৪০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে শুধু বাংলা ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে ৩০টির অধিক বই। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার বইগুলো অনূদিত হয়েছে। ‘ইসলামী পুনর্জাগরণ : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ লেখকের সাড়া জাগানো বই। ‘ইসলামের জাকাত বিধান’ বইটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। ইসলামে অর্থনৈতিক মুক্তির যে রূপরেখা তা উল্লিখিত বইটিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। এ ছাড়াও ‘সুন্নাহর সান্নিধ্যে’, ‘ইসলাম ও শিল্পকলা’, ‘ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা : তত্ত¡ ও প্রয়োগ’, ‘ইসলাম ও মানবিক মূল্যবোধ’, ‘আলিম ও স্বৈরশাসক’, ‘ইসলামের ব্যাপকতা’, ‘মুমিন জীবনে পরিবার’, ‘মধ্যমপন্থা’, ইত্যাদি গ্রন্থ পাঠকনন্দিত ও সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারক।

উস্তাদ কারযাভী ছিলেন বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের এক অসাধারণ ইমাম। বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন মিসর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তখন থেকেই ঔপনিবেশিক বিরোধী কার্যকলাপের সাথে ধর্মীয় শিক্ষাকে সমন্বয় করেছিলেন। ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তার সক্রিয়তা এবং পরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে তার সম্পৃক্ততার কারণে ১৯৫০ সালের মধ্যে তাকে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে তাকে মাতৃভ‚মি ছাড়তে একপ্রকার বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬১ সালে কাতারে পাড়ি জমান। ১৯৭৩ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন।

উস্তাদ কারযাভীর ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তার ব্যক্তিগত জীবন যশ, আর খ্যাতিতে সমৃদ্ধ। যে অঙ্গনেই সময় দিয়েছেন সে অঙ্গনেই তিনি পেয়েছেন সফলতা। তিনি ইতঃপূর্বে আল-জাজিরা টেলিভিশনে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে নিয়মিত অংশ নিতেন এবং জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান, ‘শরিয়াহ ও জীবন’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত আলোচক ছিলেন, যেখানে তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রশ্ন নিয়েছিলেন, ধর্মতাত্তি¡ক বিধি-বিধান সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দিতেন এবং সামগ্রিক বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে জাগতিক দিক ও বিশ্ব রাজনীতিসহ সব বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন।

তিনি মুসলিম স্কলারদের অভিজাত সংগঠন ‘International Union of Muslim Scholars’-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন একাডেমিক সংস্থার সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি জর্ডানের- The Royal Academy for Islamic Culture and Research, Organisation of Islamic Conference (OIC), ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী’ ও ‘ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার, অক্সফোর্ড’-এর সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আয়ারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘European Council For Fatwa and Research’ প্রধান হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

১৯৯০-৯১ সালে আলজিরিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝপরবহঃরভরপ ঈড়ঁহপরষ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিরাত ও সুন্নাহ গবেষণা’ কেন্দ্রের ডিরেক্টর হিসেবে কাতার ফিরে আসেন।

ব্যক্তিগতভাবে তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভ‚ষিত হয়েছেন, উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- ক. ১৪৪১ হিজরিতে ইসলামী অর্থনীতিতে অবদান রাখায় ব্যাংক ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন। খ. ১৪৪৩ হিজরিতে ইসলামী শিক্ষায় অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। মুসলিম বিশ্বের নোবেল খ্যাত পদকটি লাভ করেন। গ. ১৯৯৭ সালে ব্রুনাই সরকার তাকে হাসান বালকি পুরস্কারে সম্মানিত করেছিলেন। জ্ঞানগত যোগ্যতা ও মেধায় তিনি যেমন সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছেন তেমনিভাবে বিনয়ী আচরণ দিয়ে অসংখ্য মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন।

শায়খ ইউসুফ আল কারযাভী তাকি উসমানি হাফি. সম্পর্কে বলেন- ‘শাইখ মুহাম্মাদ তাকি উসমানি ইসলামী অর্থনীতির বিষয়ে আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী (আফকাহ)।’ মুফতি তাকি উসমানি শায়খ ইউসুফ আল-কারযাভী সম্পর্কে বলেন- ‘আমার কাছে এমনটি মনে হয় যেন আমরা একটি পরিবারের অংশ; সে আমাকে ভালোবাসে ও আমি তাকে ভালোবাসি। আমি তাকে সম্মান করি; তিনি (আমার কাছে) একজন উস্তাদের মতো।’

মতভেদ থাকা সত্তে¡ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রশ্নে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। একজন বিশ্ববরেণ্য আলেমের বিদায়, নিঃসন্দেহে এই বিয়োগ মুসলিম উম্মাহর এক অপূরণীয় ক্ষতি। হে প্রিয় রাহবার, আপনার মতো এমন মরমি কাণ্ডারি, প্রাজ্ঞজন হারানোর ক্ষত উম্মাহ নিশ্চয়ই অনুভব করবে। জ্ঞানের কুঞ্জবনে আপনার মতো ফুল ফুটে অচিরেই শূন্যস্থান পূরণ হোক, সেই দোয়া করছি। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সম্মানিত করুন।

লেখক : সাবেক সভাপতি, ডিবেট বাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 SomoyerKonthodhoni
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com